বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি), চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি ইতিহাস, এক অনন্য সংস্কৃতি। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এটি ছিল দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের একমাত্র আধুনিক শিল্প-কারখানা। বিশেষ করে সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকে প্রতিদিন এফডিসির একাধিক ফ্লোরে একসঙ্গে সিনেমার দৃশ্য ধারণ হতো। সে সময় শুটিং করা হতো মূলত ১৬ মিমি ও ৩৫ মিমি ফিল্ম ক্যামেরায়, যা চলচ্চিত্রকে দিত এক আলাদা নান্দনিকতা। তখনকার দিনে ফ্লোরগুলোয় পর্যাপ্ত কৃত্রিম আলো না থাকায় দিনের আলোর ওপর নির্ভর করতে হতো। সাউন্ড প্রযুক্তির অভাবে ডাবিং ছিল অপরিহার্য অংশ। সিনেমার ডাবিং, এডিটিং, সাউন্ড মিক্সিং, এমনকি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও সম্পন্ন হতো এফডিসির নিজস্ব পোস্ট প্রডাকশন ইউনিটে। কাঠ, কাপড়, রঙ ও প্লাস্টার দিয়ে তৈরি হতো দৃষ্টিনন্দন সেট। শিল্পী, কলাকুশলী, সহকারী পরিচালক—সবাই ছিলেন দায়িত্ববান, সময়নিষ্ঠ ও আন্তরিক।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত কিংবদন্তি পরিচালক কাজী হায়াত সে স্মৃতিময় দিনগুলো মনে করে বলেন, ‘আমাদের সময়ে এফডিসির পরিবেশ ছিল অসাধারণ। প্রতিদিন ফ্লোর পরিষ্কার করা হতো। অসংখ্য সিনেমার শুটিং একসঙ্গে চলত, মানুষের ভিড়ে প্রাঙ্গণ থাকত মুখর। মেকআপ রুমে গরমে কষ্ট হতো, দুর্গন্ধ ছড়াত, তবু সবার কাজের উৎসাহ ছিল সীমাহীন। একসঙ্গে এত সিনেমা চলত যে শিডিউল মেলানো কঠিন ছিল। তবুও চেষ্টা হতো সবার কাজ ঠিকভাবে সম্পন্ন করার। তখনকার দিনে চলচ্চিত্রের ছিল প্রকৃত সুদিন। বাইরের ক্যামেরা ভাড়া পাওয়া যেত, কিন্তু সবাই এফডিসির ক্যামেরা ব্যবহার করত। সাধারণত ৪০-৫০ শিফটে একটি সিনেমা শেষ হতো।

7

এফডিসির একটি স্মৃতি শেয়ার করতে গিয়ে কাজী হায়াত বলেন, ‘একবার ‘‘যন্ত্রণা’’ সিনেমার শুটিং চলাকালে হঠাৎ দেখি ক্যামেরা নেই। তখন ১২টা ক্যামেরা ছিল। বলা হলো সব ক্যামেরা বুকড হয়ে আউটডোরে গেছে। ক্ষোভে বলেছিলাম, ‘আমি কি ১২ জন পরিচালকের মধ্যে একজন নই?’ পরে মোজাম্মেল সাহেব দৌড়ে গিয়ে ক্যামেরার ব্যবস্থা করেছিলেন। তখন এফডিসি-কেন্দ্রিক সব সিনেমা তৈরি হতো। বাণিজ্যিক চিন্তাই ছিল মুখ্য, নান্দনিকতার প্রতি তেমন মনোযোগ দেয়া হতো না।’

বর্তমান এফডিসির অবস্থা নিয়ে কাজী হায়াত আরো বলেন, ‘এখন তো এফডিসিতে কাজ করি না। শুনি বাইরে আধুনিক ক্যামেরা এসেছে, কিন্তু এফডিসিতে নেই। এডিটিং ও ডাবিং সুবিধাও আগের মতো নেই, ৩৫ মিলিমিটার ফিল্মের যুগে এমন অবস্থা ছিল না।’

8

অন্যদিকে চলচ্চিত্র পরিচালক মালেক আফসারী বলেন, ‘আমাদের সময় শিল্পীরা সময়মতো সেটে উপস্থিত হতেন এবং পেশাদারত্ব ছিল সর্বোচ্চ মানের। নায়ক-নায়িকা, শিল্পীরা একে অন্যের সঙ্গে মেলামেশা করতেন, একে অন্যের সেটে যেতেন। একটি দৃশ্য ধারণে আমরা সময় নিতাম, আমার সিনেমা শেষ হতো ৬০-৭০ দিনে। দিনের আলো ব্যবহার করতাম, কারণ সবসময় পর্যাপ্ত লাইট ছিল না। শিল্পীরা ক্যামেরার সামনে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতেন। এফডিসি ছিল যেন এক পরিবার, সবাই সবাইকে চিনতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন। তখনকার যন্ত্রপাতি দিয়েই অসাধারণ সিনেমা তৈরি হতো।’

বর্তমান এফডিসি প্রসঙ্গে আফসারী বলেন, ‘এখন সিনেমা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে, তবে তা এফডিসিতেই করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। আস্তে আস্তে এফডিসির প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে আসছে।’

9

পরিচালক ইস্পাহানি জাহান জানান, ‘এফডিসির ভেতরে-বাইরে কাজের সময় সবার মধ্যে সহযোগিতা ও সম্পর্ক ছিল দৃঢ়। আমরা আনন্দের সঙ্গে কাজ করতাম এবং ছবির ব্যবসাও ভালো হতো। আমরা নিশ্চিত থাকতাম যে ছবি মুক্তি পেলে সফল হবে। আজ প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে, কিন্তু এফডিসির যন্ত্রপাতি পুরনো হয়ে গেছে। মানসম্মত টেকনিশিয়ান তৈরি হয়নি। ফলে এখন অনেক সিনেমা দেশের বাইরে শুট হয়। এফডিসি থেকে মানুষ বিমুখ হয়ে পড়েছে কারণ খরচও বেশি। অন্য জায়গায় ২০ লাখ টাকায় যে কাজ হয়, এফডিসিতে সেটাই করতে লাগে প্রায় ৪০ লাখ। নানা সমস্যার সমাধান না করলে এফডিসি তার আগের গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তবে যদি তারা আধুনিকীকরণে মনোযোগ দেয়, তা অবশ্যই আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।’

চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান এফডিসির আগের সেই গৌরবের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এফডিসির ফ্লোরগুলো এখন অনেক সময় খালি পড়ে থাকে। নির্মাতারা পুবাইল, সাভার, বান্দরবান বা বিদেশী লোকেশনে শুটিং করছেন। ডিজিটাল ক্যামেরা, ড্রোন, ক্রোমা ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্যবহার সেট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। সময় ও খরচ বাঁচাতে সবাই বিকল্প পথে হাঁটছেন। তবুও এফডিসি আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এক স্মৃতিময় তীর্থস্থান। এখানেই তৈরি হয়েছে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুতরাং’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা’-র মতো কালজয়ী সিনেমা। এখনো মনে হয়, সেই ফ্লোরের দেয়ালে কান পেতে শুনলে ভেসে আসবে পুরনো দিনের ডাক—‘লাইট ক্যামেরা অ্যাকশন!’