প্রখ্যাত বাউলশিল্পী সুনীল কর্মকার মারা গেছেন। শুক্রবার ভোর ৪টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের সমস্যাসহ নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।
সুনীল কর্মকার ছিলেন দৃষ্টিহীন। এর পরও তিনি সাধনা, কণ্ঠ আর সুরের জাদুতে লোকসংগীত অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছিলেন। বাউল, মালজোড়া, মহাজনি গান ও লোকসংগীতে অসামান্য অবদান তার। লোকসংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০২২ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শিল্পকলা পদক লাভ করেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সুনীল কর্মকার ১৯৫৯ সালের ১৫ জানুয়ারি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার বার্নাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম দীনেশ কর্মকার ও মায়ের নাম কমলা কর্মকার। তিন ভাইয়ের মধ্যে সুনীল ছিলেন বড়। সুনীল কর্মকার মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই গানের সঙ্গে যুক্ত হন। ভরাট ও আবেগময় কণ্ঠে আসর মাতিয়ে তুলতেন তিনি। বেহালা, দোতারা, তবলা ও হারমোনিয়ামসহ একাধিক বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী ছিলেন। ছোটবেলায় তিনি টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে চোখের আলো হারান। এরপর দৃষ্টিহীন এ শিল্পীজীবন গড়ে তোলেন গানের সঙ্গে। তারই গ্রামের পাশের বিখ্যাত গীতিকবি ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর অসংখ্য গানে সুর করে কণ্ঠ দিয়েছেন। তার নিজের লেখা গানের সংখ্যা দুই শতাধিক।

ময়মনসিংহের সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, মাত্র সাত বছর বয়সেই গান যেন তার রক্তের প্রতিটি বিন্দু দখল করে নিয়েছিল। সে সময় পাশের গ্রামে বিখ্যাত গীতিকবি জালাল উদ্দিন খাঁর বাড়িতে নিয়মিত বসত বিশাল গানের আসর। সেই আসরের টানে ছোট্ট সুনীল ছুটে যেতেন সেখানে। গ্রাম থেকে গ্রামে যেখানেই গান, সেখানেই ছিল তার উপস্থিতি। ছেলের এ অদম্য আগ্রহ দেখে বাবা দীনেশ কর্মকার তাকে নিয়ে যান স্থানীয় বাউল গায়ক ইসরাইল মিয়ার কাছে। সেখানে সংগীত শিক্ষার পাশাপাশি দোতারা বাজাতেও তিনি দক্ষ হয়ে ওঠেন।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শিল্পী সুনীল কর্মকার দীর্ঘকাল ধরে বাউল ও লোকসংগীতের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে আধ্যাত্মিক চেতনার বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি শুধু একজন গায়ক ছিলেন না, ছিলেন গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্যের ধারক। একতারা ও দোতারার ছন্দে তার কণ্ঠের সেই বিশেষ আবেদন শ্রোতাদের মুগ্ধ করত। সংগীতই ছিল তার একমাত্র ধ্যান ও জ্ঞান।’
সুনীল কর্মকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। তার মৃত্যুতে এক শোকবার্তায় সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘আমাদের এ ভূখণ্ডের মানুষ তার জাগতিক আনন্দ-বেদনার বোধের পাশাপাশি দার্শনিক ভাবনা ও সমাজচিন্তার প্রকাশ করেছে গান রচনার মধ্য দিয়ে। দেশের চিন্তার ঐতিহ্য তাই কোনো দর্শনের বইয়ে না খুঁজে খুঁজতে হয় আমাদের গানে। লালন, হাসন, জালাল খাঁ, শাহ করিমসহ আরো অগণিত ভাবুক বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। সুনীল কর্মকার জালাল খাঁ ঘরানার একজন বিশিষ্ট সংগীত ও ভাবসাধক। ... এই শোকসংবাদ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বেদনার্ত করেছে। সামষ্টিকভাবে এটি আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করি।’










