নতুন সময়ে নতুন পথে চলছে বাংলাদেশের সিনেমা। বাণিজ্যিক সিনেমা ভালো করার পাশাপাশি চেষ্টা চলছে নতুন ধরনের, অফ-ট্র্যাকের সিনেমা নির্মাণের। তেমনই একটি সিনেমা ‘দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল’। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, গণরুম কালচার ও রাজনীতি নিয়ে সিনেমার গল্প। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ২৪তম আসরে সিনেমাটি ‘বাংলাদেশ প্যানোরামা’ বিভাগের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র শাখায় ফিপ্রেস্কি জুরি বেস্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ আয়োজিত ‘আমার ভাষার চলচ্চিত্র উৎসব’-এ সিনেমাটি পেল হীরালাল সেন পদক। দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চারখাঁরপুল নির্মাতা মনিরুল হক আকাশ সিনেমার মাধ্যমে সমাজের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে চান, যেন সেসব জায়গায় পরিবর্তন আসে। তার এ সিনেমাও সেই প্রচেষ্টারই অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের ছাত্র আকাশ তার পড়াশোনার সময়ই সিনেমার দিকে ঝুঁকেছিলেন। কেননা সিনেমাও মনস্তত্ত্ব নিয়েই কাজ করে। পড়াশোনা চলাকালীন হিপহপ, র‍্যাপ গানের ভিডিওচিত্র নির্মাণ করেন তিনি। একসময় সিনেমা নির্মাণের চিন্তা করেন। সিনেমাটির আইডিয়া নিয়ে আকাশ বলেন, ‘আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ভর্তি হই তখনই চিন্তাটা মাথায় আসে। আমরা একটা বৈচিত্র্যময় জায়গায় থাকি। সেটাই তুলে আনার চিন্তা ছিল। এর পরই মাথায় আসে কিছু সমস্যার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে খাবার ও আবাসন সংকট প্রবল। প্রথমে মনে হয়েছিল বিষয়টা সংকট। তবে পরবর্তীকালে দেশের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখার পর মনে হলো, আমাদের সঙ্গে রীতিমতো অন্যায় করা হয়। এসব কারণেই বিষয়গুলো নিয়ে সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করি।’

২০১৫-১৬ সাল থেকেই সিনেমাটির পরিকল্পনা করছিলেন মনিরুল হক আকাশ। কিন্তু সেই সময় নানা বিরুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেই সিনেমাটি নির্মাণ সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে সিনেমা নির্মাণ শুরু হলে নিজেদের মতো করেই লজিস্টিক ও ব্যবস্থাপনা করেছেন আকাশ ও তার টিম। তিনি জানান চিত্রনাট্য, পরিচালনা, সম্পাদনা, সংগীত, শব্দ, প্রডাকশন ডিজাইন, আর্ট ডিজাইন মনিরুল হক নিজেই করেছেন। প্রচার বিভাগটি দেখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ফারহানা ফারহা।

অভিনেতা বাছাই প্রসঙ্গে মনিরুল হক বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম চরিত্রগুলোর সঙ্গে জাস্টিস করে এমন মানুষ বেছে নিতে। তো একটা চরিত্র লেখা হলো, সে দেখতে কেমন হবে, তার আচরণ কেমন হবে, সেটাও নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এ বিষয়গুলো যাদের সঙ্গে মিলেছে তাদেরই কাস্ট করা হয়েছে। আর অভিনেতাদের নেয়া হয়েছে প্রাচ্যনাট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকে।’ সিনেমার প্রধান কয়েকটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেবদ্যুতি আইচ, রকি খান, ববি বিশ্বাস, মেহেদী হাসান সোহান। আরো অভিনয় করেছেন চয়ন মন্ডল, আবু সায়ীদ, ইফাদ হাসান ও এসএ জীবন। একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাহিত্যিক ও কবি আক্তারুজ্জামান আজাদ। তবে একটা মজার ব্যাপার হলো, এই সিনেমায় কোনো চরিত্রের কোনো নাম নেই। আকাশ বলেন, ‘কার কথা বলা হচ্ছে তা বোঝা যাবে কিন্তু এ সিনেমায় কোনো চরিত্রের নাম বলা হয় না। আমরা ভিন্নভাবে গল্পটা বলার চেষ্টা করেছি যা দর্শক নিজের সঙ্গে যুক্ত করতে পারবেন।’

সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রয়োজন হয় অর্থ। সেটার ব্যবস্থা করাও একটা চ্যালেঞ্জ। বিশেষত প্রথম সিনেমার জন্য নির্মাতাকে খাটতে হয় আরো বেশি। মনিরুল হক জানান, তারা নিজেদের খরচেই সিনেমাটা নির্মাণ করেছেন। আর এক্ষেত্রে নিজেদের রিসোর্স ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, ‘কাউকে অগ্রিম টাকা দেয়ার প্রয়োজন এখানে ছিল না। আর যা খরচ তা আমরা নিজেরাই জোগাড় করেছি। অনেক জায়গায় ইনোভেশন করার চেষ্টা করেছি। নিজেদের বাসায়ই ডাবিং করেছি। কোনো স্টুডিওতে যাইনি। নিজেদের বেডরুম, ড্রইং রুমেই শুট করেছি।’

দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুর আলোচিত হচ্ছে। পুরস্কারও পাচ্ছে। মনিরুল হক এ নিয়ে খুশি তবে তিনি মনে করেন, যে সমস্যাগুলো তিনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সেগুলোর সমাধান হলেই সত্যিকার পুরস্কার পাওয়ার আনন্দ আসবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম সিনেমা, সিনেমাটা কেমন হয়েছে সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। এর মধ্যে পুরস্কারও পেয়ে যাই ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। খুশি তো অবশ্যই, তবে আমরা এ পুরস্কার পাওয়ার বিষয়গুলোর চেয়ে সিনেমায় যে সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়েছে তা সমাধান হওয়ার বিষয়ে বেশি আগ্রহী। সেটা হলেই পুরস্কার পাওয়ার প্রকৃত আনন্দটা আসবে।’