বাংলাদেশের নাট্যজগৎ ও চলচ্চিত্রে এক অনন্য নাম ডলি জহুর। কয়েক দশকের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন অভিনয়ের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। ছোট পর্দা হোক কিংবা বড় পর্দা—সব মাধ্যমেই তিনি রেখে গেছেন তার অসাধারণ অভিনয় প্রতিভার স্পষ্ট ছাপ। ডলি জহুরের অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল মঞ্চনাটক দিয়ে। এরপর টেলিভিশন নাটকে তার আবির্ভাব ঘটে ১৯৮০-এর দশকে, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘নোনাজলের কাব্য’সহ অসংখ্য নাটক ও চলচ্চিত্রে তার অবদানের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারসহ বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি একটু আড়ালেই রয়েছেন। তার ক্যারিয়ারের নিজের পাঁচটি সিনেমার গল্প বলেছেন অভিনেত্রী। শুনেছেন অহিদুর রহমান
শঙ্খনীল কারাগার
এ সিনেমায় আমি রাবেয়া চরিত্রে অভিনয় করি। চরিত্রটি আমার পাওয়ার কথা ছিল না। হুমায়ূন আহমেদ সাহেবের ইচ্ছা ছিল রাবেয়া চরিত্রে সুবর্ণা মুস্তাফাকে কাস্ট করার। কিন্তু মুস্তাফিজুর ভাই আমাকে কাস্ট করে। রাবেয়া চরিত্রটা এমন যে সে দেখতে তেমন ভালো নয়, বয়স হয়ে গেছে, বিয়ে হচ্ছে না। কিন্তু সুবর্ণা আমার থেকে সুন্দর ও অল্প বয়সী। চরিত্রটা সুবর্ণার সঙ্গে মানানসই হবে না। যার কারণে হুমায়ূন সাহেবের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মুস্তাফিজুর রহমান শঙ্খনীল কারাগারে আমাকেই কাস্ট করলেন। তিনি চেয়েছিলেন, চরিত্রটা আমিই করি। কাজটা শেষ হওয়ার পর যখন সিনেমাটির প্রিমিয়ার শো হয়, তখন খালেদা জিয়া ক্ষমতায় ছিলেন। সে অনুষ্ঠানে তিনি গিয়েছিলেন। এ সিনেমার জন্য ১৯৯২ সালে আমি ‘শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী’ হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাই।
পরিচালনা: মুস্তাফিজুর রহমান
অভিনয়ে: ডলি জহুর, আসাদুজ্জামান নূর, শামীমা চৌধুরী, মাহফুজ আহমেদ প্রমুখ।
মুক্তির তারিখ: ২২ মে ১৯৯২
আগুনের পরশমণি

‘আগুনের পরশমণি’ সিনেমায় আমি সুরমা চরিত্রে অভিনয় করি। যখন সিনেমাটি নিয়ে কথা হয়, তখন আমি সিনেমায় অভিনয় নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম। শিডিউল ম্যানেজ করা কঠিন ছিল। কারণ এফডিসিতে এ সিনেমার একটা সেট ফেলবে, সেটটা টানা চলবে যতদিন সিনেমা শেষ না হয়। টানা শিডিউল তো আমার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ অন্য সিনেমাকে শিডিউল দেয়া আছে। শিডিউল গ্যাপ পাওয়া মুশকিল। একদিন আমাদের সবাইকে মোজাম্মেল স্যারের বাসায় বসতে বলা হলো। সবাই গেল, আমিও গেলাম। তখন উপস্থিত সবাইকে শিডিউল বলতে বললে আমি আমার ব্যস্ততার কথা জানাই হুমায়ূন সাহেবকে। তখন হায়াত ভাই বলে উঠলেন, ডলি না হলে এটা হবে না। এরপর অন্য সিনেমা থেকে সময় বের করে আগুনের পরশমণিতে অভিনয় করি।
পরিচালনা: হুমায়ূন আহমেদ
অভিনয়ে: আসাদুজ্জামান নূর, বিপাশা হায়াত, আবুল হায়াত, ডলি জহুর, শিলা আহমেদ প্রমুখ।
মুক্তির তারিখ: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৪
সন্তান যখন শত্রু

এ সিনেমায় আমি মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করি। সিনেমায় আমার চরিত্রটি সন্তানদের অবহেলা, স্বার্থপরতা ও নির্দয় আচরণের শিকার হয়। এটি আমার অন্যতম ভালো লাগার সিনেমা। সিনেমাটিতে রাজ্জাক ভাই খুবই সিরিয়াস ছিলেন কাজের ব্যাপারে। আমরা একসঙ্গে বসে সেটে হাসাহাসি করতাম, এটা রাজ্জাক ভাই পছন্দ করতেন না। সেটে ঢোকার পর কেউ কারো সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। আকার ইঙ্গিতে কথা বললেও তিনি রেগে যেতেন।
পরিচালনা: রাজ্জাক
অভিনয়ে: রাজ্জাক, ডলি জহুর, বাপ্পারাজ, শাবনূর, চম্পা, আফজাল শরীফ, মিশা সওদাগর প্রমুখ।
মুক্তির তারিখ: ৮ অক্টোবর ১৯৯৯
বাবা কেন চাকর
এ সিনেমায় আমি মায়ের চরিত্রে অভিনয় করি। আমার চরিত্রটি পরিবারকে একত্রে ধরে রাখার চেষ্টা করে। স্বামীর অপমান ও সন্তানের অবহেলার মাঝে দারুণ এক মানসিক দ্বন্দ্ব থাকে।
সন্তানরা বড় হয়ে কীভাবে বাবা-মাকে অবহেলা করে এবং অভিভাবকদের আত্মমর্যাদা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এ বিষয়গুলো সিনেমায় উঠে আসে। এ সিনেমায় অনেকেই রাজ্জাক ভাইকে বলেছিল, ডলিকে কেন নেয়া হচ্ছে। এটা তো শাবানার ক্যারেক্টার। আমি রাজ্জাক ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে সিনেমাটিতে কাস্ট করেছিলেন। সিনেমাটি যখন রিলিজ হয়, তখন সাভারে আমরা মমতাজুর রহমান আকবরের একটা সিনেমার শুটিংয়ে ছিলাম। তখন আমি আকবর ভাইসহ অনেকেই উঠানে বসে আছি। হঠাৎ করে রাজ্জাক ভাই বলছে, বুঝলে আকবর, তোমরা না বলো শাবানার চোখের পানির মূল্য ১ কোটি টাকা, ডলি তো আমাকে ৩ কোটি টাকা দিয়ে দিল। প্রথম রাউন্ডে ৩ কোটি টাকা আয় করে সিনেমাটি। তখন বাংলা সিনেমার অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। রাজ্জাক ভাই খুব সুচারুভাবে সিনেমাটি নির্মাণ করেছিলেন। এতে রাজ্জাক ভাইয়ের আমার প্রতি কোনো অভিযোগ ছিল না।
পরিচালনায়: রাজ্জাক
অভিনয়: রাজ্জাক, ডলি জহুর, বাপ্পারাজ, অমিত হাসান, আঞ্জুমান আরা শিল্পী প্রমুখ।
মুক্তির সাল: ৮ আগস্ট ১৯৯৭
আনন্দ অশ্রু
এ সিনেমায় আমি অভিনয় করি শাবনূরের মা চরিত্রে। আমার চরিত্রটা এমন ছিল যে নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। যে চায়নি তার মেয়ে (শাবনূর) প্রেমে জড়িয়ে এমন একজনকে বিয়ে করুক, যার সামাজিক অবস্থান বা অর্থনৈতিক ভিত্তি নিম্নমানের। সিনেমাটির একটি সেটের গল্প শেয়ার করব, সেটা হলো—শয়তানরা আমাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। তখন শাবনুর আমাকে জাপটিয়ে ধরে চিৎকার করে। আমিও শাবনূরকে জাপটে ধরেছি। আমাদের হাতের পশম পুড়ে গিয়েছিল। গায়ে আগুন লাগা বাকি ছিল। মাথায় চুল পুড়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল। শাবনূর যে ভয়ের কারণে চিৎকার করছিল, সেটা অভিনয়ে এসে গেছে। এটা একটা অন্য রকম অভিজ্ঞতা ছিল।
পরিচালনা: শিবলি সাদিক
অভিনয়: সালমান শাহ, শাবনূর, আলীরাজ, রোজী সামাদ, ডলি জহুর প্রমুখ।
মুক্তির সাল: ১ আগস্ট, ১৯৯৭










