‘প্রিয় মালতী’, ‘কারাগার’ ও ‘তাকদীর’-র মতো সিনেমা নির্মাণে আবহ সংগীতের মাধ্যমে দর্শককে আবেগের গভীরে নিমজ্জিত করার অভিজ্ঞতা অর্জনের পর এবার প্রেসার কুকারেও নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখেছেন সংগীত পরিচালক, গায়ক ও সুরকার রুসলান রেহমান। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা খুলনায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে সিনেমার প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম ডিপার্টমেন্টে অধ্যয়ন করেছেন। তার সঙ্গে আলাপচারিতা করেছেন আনিকা চৌধুরী প্রিয়ন্তি
কতদিন সময় লেগেছে প্রেসার কুকারের আবহ সংগীত করতে?
এ সিনেমার ক্ষেত্রে সময়টা একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। আমি সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হই ফেব্রুয়ারির ২৫-২৬ তারিখে। ২০ দিনের মতো সময় পেয়েছি। গল্পটা বিস্তীর্ণ, সে তুলনায় সময়টা কম। তবুও প্রেসার কুকারের আবহ সংগীত সবার চেয়ে আলাদা হয়েছে। কারণ এখানে চারটা গল্প বলা হয়েছে। একটা গল্প থেকে আরেকটা গল্পে প্রবেশ করাটা খুব দ্রুত হয়েছে। তাই প্রত্যেকটা চরিত্র ও থিম ধরে এগোতে হয়েছে। একেবারে ‘জ্যাজ’ ঘরানা থেকে শুরু করে হামদ নাথ পর্যন্ত অনেক জনরা ব্যবহার করা হয়েছে। একদিকে ক্ল্যাসিক্যাল, বাঙালিয়ানা বাঁশির সুর, অন্যদিকে চেলো, গিটার, পিয়ানো আবার হেভি র্যাপ, অ্যারাবিয়ান হিপহপ সব রকম জনরাই ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু ট্র্যাক আমরা নিজেরা তৈরি করেছি, কিছু রায়হান রাফী নিজে সংগ্রহ করেছেন। সবকিছু মিলিয়ে পুরো জিনিসটা আমাকে সমন্বয় করে চূড়ান্ত আবহটা তৈরি করতে হয়েছে।
একটা সিনেমার জন্য আবহ সংগীত ঠিক কী কী কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে?
সিনেমার সঙ্গে মূলত আমার পথচলা শুরু ২০১৯ সাল থেকে ওয়েব সিরিজ ‘তাকদীর’-এর সঙ্গে। সে সময় তাকদীরের আবহ সংগীত খুব সাড়া ফেলেছিল। সিনেমার আবহ সংগীত নিয়ে এর আগে খুব একটা আলোচনা ছিল না। ধীরে ধীরে সিনেমার আবহ সংগীতের জায়গাটা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে তৈরি হতে থাকে। এখানে পরিচালক সৈয়দ আহমেদ শাওকির একটা অবদান আছে। তিনি তার নির্মাণে আবহ সংগীতকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। ‘কারাগার’-এর জন্য ডেইলি স্টার অ্যাওয়ার্ড পেলাম। ‘গুলমোহর’ তো একেবারেই মিউজিক্যাল ফিল্ম। সব মিলিয়ে আবহ সংগীত আসলে সিনেমার একটা চরিত্র হয়ে ওঠে। সিনেমার অনেক দৃশ্য আছে, যেখান থেকে আবহ বাদ দিয়ে দিলে সে দৃশ্যের আর কোনো অর্থই থাকবে না। নির্মাতারা একটা দৃশ্য কল্পনা করার ক্ষেত্রে সেটার আবহ সংগীতটা কল্পনা করেই ডিজাইন করেন। তাই এটি সিনেমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময়ই সিনেমা হলে মুক্তি পাওয়ার পর দর্শকের কাছ থেকে অভিযোগ আসে শব্দ পরিষ্কার নয়। এর কারণ কি হলের সাউন্ড সিস্টেম, নাকি আপনাদের জায়গা থেকে কোনো কমতি?
অনেক কারণেই এটা হয়। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে আবহ সংগীত করে এমন লোকবলের অভাব আছে। প্রচণ্ড ধৈর্য আর সিনেমার প্রতি প্যাশন না থাকলে এ পেশায় টিকে থাকা মুশকিল। তাছাড়া ইন্ডাস্ট্রিটা এখনো সেভাবে দাঁড়ায়নি, ফলে আর্থিক স্বচ্ছলতার একটা ব্যাপার আছে। সব মিলিয়ে এখানে গুটিকয়েক মানুষ আমরা কাজ করছি। তাই কাজের প্রেসারটা অনেক বেশি থাকে। সেক্ষেত্রে অনেক সময় আমাদের দিক থেকেও এদিক-ওদিক হয়। আরেকটা বিষয় হলো আমাদের সিনেমা হলের সাউন্ড সিস্টেম। একেকটার ফরম্যাট একেক রকম। আমরা তো আবহ সংগীত একটা ফরম্যাটেই করি। ফলে কোনো হলে ভালো শোনা যায়, আবার কোনো হলে শব্দ শোনাই যায় না। এক্ষেত্রে আসলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রণোদনা দিতে হবে। ফিল্ম স্কুল নির্মাণ করতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আন্তর্জাতিক মানের হওয়া সম্ভব।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমাদের আবহ সংগীত বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কতটা এগিয়ে আছে?
প্রযুক্তির ব্যবহার আমরা সম্পূর্ণভাবে করছি। প্রেসার কুকারেও অনেক মিউজিশিয়ান দেশের বাইরে থেকে মিউজিক বাজিয়ে পাঠিয়েছেন। প্রযুক্তির কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যেসব ব্যবহার রয়েছে, তার সবটুকুই আমরা করতে পারি। অনেক সফটওয়ার আছে। সেগুলোর অ্যাকসেস আমরা চাইলেই নিতে পারছি। তাই এদিক থেকে বলতে পারি আমরা খুব একটা পিছিয়ে নেই।
সামনে আর কী কী কাজ আসছে?
অনেকগুলো কাজই পাইপলাইনে আছে। অনম বিশ্বাস পরিচালিত ‘ঠিকানা বাংলাদেশ’ এ কাজ করছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একটা সিনেমার পরিকল্পনা চলছে। এছাড়াও শঙ্খদাস গুপ্তের পরিচালনায় ‘চা গরম’-এ কাজ করলাম। সেটার মুক্তির অপেক্ষায় আছি। সালেহ সোবাহান অনিমের ওয়েব সিরিজ ‘হেডলাইন’ এও কাজ করার পরিকল্পনা চলছে। আর আমার নিজস্ব ব্যান্ড ‘দ্য রেহমান ডুও’তে নিজের গানের কাজ চলছে।










