২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয়েছে ১০ জানুয়ারি। দেশের সবচেয়ে বড় এ আন্তর্জাতিক আয়োজনকে ঘিরে প্রতি বছরই দর্শক, নির্মাতা ও চলচ্চিত্র কর্মীদের আলাদা উত্তেজনা কাজ করে। স্থানীয় আগ্রহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ উৎসবের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে ধীরে ধীরে। এবারের এ আয়োজনে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল বিভাগে জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চলচ্চিত্র সমালোচক ও বিশ্লেষক বিধান রিবেরু। এবারের উৎসব নিয়ে তার ভাবনা তুলে ধরেছেন অহিদুর রহমান
উৎসবের ভেতরের শক্তি ও নেতৃত্বের ভূমিকা
প্রতি বছরই নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। এবারো নানা চ্যালেঞ্জের পরও সফলভাবেই চলছে এ উৎসব। উৎসব আয়োজনের পেছনের বাস্তবতা সহজ নয় বলে মনে করেন বিধান। তবু এ উৎসব ধারাবাহিকভাবে টিকে আছে মূলত নেতৃত্বের দৃঢ়তার কারণে। তার কথায়, ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর আহমেদ মুজতবা জামালের দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা ও দৃঢ় অবস্থানই এ উৎসবকে ৩৩ বছর ধরে এগিয়ে নিচ্ছে। নানা বাধা এলেও দর্শকের কাছে উৎসবটি সব সময়ই উৎসব হিসেবে ধরা দেয়।
নতুন সিনেমা, নতুন পরিসর
প্রতি বছরের মতো এ বছরও উৎসবের বড় শক্তি হচ্ছে নতুন নতুন চলচ্চিত্র। তার মতে, উৎসব মানেই নতুন গল্প ও নতুন নির্মাণভঙ্গি। এ বছর মাস্টারক্লাসে থাকছেন নতুন বক্তারা, যারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছেন। গত বছর যুক্ত হওয়া আর্ট এক্সিবিশন এবারো থাকছে। পাশাপাশি ইস্ট মিটস ওয়েস্ট স্ক্রিনপ্লে ল্যাবের পরিসর আরো বাড়ানো হয়েছে, যা তরুণ নির্মাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও উৎসব
বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নেই, এ কথা স্পষ্ট। বিনোদন দুনিয়ায়ও এর প্রভাব সাম্প্রতিককালে চোখে পড়েছে। দেশের রাজনৈতিক এ পরিস্থিতির মাঝেও এবারের উৎসবটি হচ্ছে, এটা নিয়ে সন্তুষ্ট রিবেরু। তার মতে, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির জায়গা থেকেই এ উৎসব মানুষের কাছে আশার জায়গা তৈরি করেছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিল্পচর্চা চলমান থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
জুরি হিসেবে অভিজ্ঞতা ও নতুন চ্যালেঞ্জ
ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এর আগে দুবার ফিপ্রেসি জুরি ছিলেন বিধান রিবেরু। এবারের উৎসবে পেয়েছেন ওয়াইড অ্যাঙ্গেল বিভাগের জুরির দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পাওয়াকে তিনি দেখছেন সম্মান ও আনন্দের সমন্বয় হিসেবে। তবে এবার একটি স্বতন্ত্র বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার জন্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তার মতে, প্রতিটি দায়িত্বই তাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। বলেন, ‘একটি আলাদা বিভাগের জুরি হিসেবে কাজ করা নিঃসন্দেহে আমার জন্য সম্মানের ও নতুন অভিজ্ঞতার।’
ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ও আন্তর্জাতিক সংযোগ
ওয়াইড অ্যাঙ্গেল বিভাগ বরাবরই কম আলোচিত। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের জায়গা। এ বছর বিভাগটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে আন্তর্জাতিক সংযোগের কারণে। তার কথায়, ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এবার সাংহাই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের বেল্ট অ্যান্ড রোড অ্যালায়েন্সের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে সাংহাই ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড সেগমেন্টের চারটি চলচ্চিত্র এ উৎসবের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল বিভাগে দিয়েছে। চারটি সিনেমা থেকেই সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচন করা হবে। তিনি বলেন, ‘এ সেকশনে আছে চারটি সিনেমা, যেগুলো থেকে আমরা একটি সেরা সিনেমা বাছাই করব।’
জুরি হিসেবে সিনেমা দেখার প্রক্রিয়া
প্রতিটি চলচ্চিত্র উৎসবেই জুরিরা সিনেমা দেখে সেরা সিনেমা নির্বাচন করেন। ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জুরিরা উৎসব চলাকালেই একসঙ্গে বসে চলচ্চিত্র দেখেন। তার মতে, পারস্পরিক আলোচনা ছাড়া সেরা সিনেমা নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই জুরি মিটিং ও যৌথ মূল্যায়ন এ উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, ‘অন্য জুরিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই আসলে সেরা সিনেমা কোনটি হবে, তা ঠিক করা হয়।’
চলচ্চিত্র মূল্যায়নের মূল জায়গা
সব চলচ্চিত্র উৎসবেই নানা বাছাইয়ের পর ভালো সিনেমাগুলোই নির্বাচিত হয় প্রদর্শনের জন্য। তবে সব সিনেমা থেকেও আবার সেরা নির্বাচনের প্রক্রিয়া থাকে। সেরা সিনেমা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে জুরিরা দেখেন সিনেমার নানা বিষয়। একটি চলচ্চিত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রিবেরু সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন সিনেমার বক্তব্যকে। গল্প ধ্বনিচিত্রের মাধ্যমে কতটা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, সেটাই তার কাছে মুখ্য। এরপর তিনি গুরুত্ব দেন নির্মাণভঙ্গিকে—এডিটিং, সিনেমাটোগ্রাফি। তার মতে, গল্প বলার ধরনই নির্মাতার অবস্থান স্পষ্ট করে। বলেন, ‘আমি সর্বাধিক গুরুত্ব দিই সিনেমার বক্তব্যকে।’










