আকাশে কালো মেঘ দেখলেই আঁতকে ওঠে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধের অভ্যন্তরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লালপুর, পৌষা পুকুরপাড়সহ ডিএনডি এলাকার বাসিন্দারা। ঘরের আসবাবপত্র ও বিছানা ইট দিয়ে উঁচু করতে শুরু করেন। গত এক সপ্তাহ ধরে মুষলধারে বৃষ্টির কারণে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এ অঞ্চলে। সেই সঙ্গে এলাকাবাসীর দুর্ভোগও অসহনীয় পর্যায়ে গিয়েছে। প্রতি বছরের জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ ছাড়িয়ে গেছে এ বছর। এমন কোনো বাড়ি নেই, যেখানে প্রবেশ করেনি দুর্গন্ধযুক্ত পচা পানি। কিন্তু প্রতিকারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিরা।

রাজধানী সংলগ্ন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার লালপুর, পৌষা পুকুরপাড়, দেলপাড়া, কুতুবপুরসহ কয়েকটি এলাকা। বিশেষ করে লালপুর ও পৌষা পুকুরপাড় এলাকাটি নিচু এলাকা হওয়ায় দু-তিনদিনের টানা বর্ষণেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও আবার কোমর পানি। পাকা সড়কে চলাচল করছে নৌকা। মানুষের চলাচলের জন্য ভ্যানগাড়ি ও রিকশার সিটও পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। গত দুই দশক ধরে জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগের শিকার হয় এসব এলাকার দুই লক্ষাধিক মানুষ। চলমান করোনা আতঙ্কের সঙ্গে এসব এলাকায় এখন নতুন আতঙ্ক যোগ হয়েছে ডেঙ্গু ও ডায়রিয়া। পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঝুঁকির সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা পানিবাহিত রোগ।

পৌষা পুকুরপাড় এলাকার বাসিন্দা জব্বার মিয়া, রাশেদুল হাসান জানান, গত দুই দশক ধরে বর্ষা মৌসুমে কয়েকদিনের বৃষ্টিতেই পানির নিচে তলিয়ে যায় বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট। জলাবদ্ধতার হাত থেকে বাঁচতে দফায় দফায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে গিয়ে ধরনা দিয়েছি। কিন্তু কোনো প্রতিকার মেলেনি।

মোরসালিন, সুমি বেগমসহ কয়েকজন জানান, পানি প্রতিদিনই বাড়ছে। কারণ কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। যার কারণে রান্নাঘরের চুলা, টিউবওয়েল, বাথরুম, মসজিদ সবই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শিল্প-কারখানার বজ্রমিশ্রিত নোংরা কালো পানিতে সয়লাব হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা।

সাবিকুন নাহার ও জলি বেগম জানান, বৃষ্টির কারণে পানি ফুলে ওপরের দিকে উঠছে। ফলে প্রতিদিনই ইট দিয়ে খাট উঁচু করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়তে হয়েছে পয়োনিষ্কাশন করতে। বিশুদ্ধ পানির বড় অভাব দেখা দিয়েছে। ফলে দোকান থেকে বিশুদ্ধ পানি কিনে খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিদিনই পানি সেচে ফেলা হচ্ছে। কিন্তু যে পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে তাতে কোনো সুফল মিলছে না।

ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান খন্দকার লুত্ফর রহমান স্বপন জানান, পৌষা পুকুরপাড়, লালপুরসহ কয়েকটি এলাকা একটু নিচু। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই এ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এসব এলাকার জনদুর্ভোগ লাঘবে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, অপরিকল্পিতভাবে বসতি গড়ে ওঠা এবং পানি নিষ্কাশনের খালগুলো ভরাট করে বাড়িঘর নির্মাণ করায় জলাবদ্ধতার পানি সরছে না। ভবন ভেঙে বা বিকল্প খাল কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এ জলাবদ্ধতা কমবে না। ডিএনডি প্রকল্পের কাজ শেষ হলেই জলাবদ্ধতার সমাধান মিলবে। তিনি আরো বলেন, গত সপ্তাহে সেনাবাহিনী পানি নিষ্কাশনের জন্য দুটি ১০০ হর্স পাওয়ারের মেশিন স্থাপন করেছে। আরো একটি পাম্প বসানোর প্রক্রিয়া চলছে।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, লালপুর, পৌষা পুকুরপাড়ের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দুটি পাম্প বসানো হয়েছে। তত্ক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে আরো একটি পাম্প বসানোর জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান করার জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি ও জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে কাজ করা হবে।

উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জের ডিএনডি প্রজেক্টের ৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনী।