লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস এলাকায় অবস্থিত প্রাচীন ইসলামী নিদর্শন ‘৬৯ হিজরির হারানো মসজিদ’। এ মসজিদ দেখতে ও এর ইতিহাস জানতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। তবে মসজিদটির প্রকৃত নির্মাণকাল ও সঠিক ইতিহাস আজও রহস্যঘেরা। এ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা কথা ও জনমনে রয়েছে কৌতূহল। প্রাচীন এ জনপদের সঠিক ইতিহাস উন্মোচনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের গবেষণা ও কার্যকর উদ্যোগ দাবি করেছেন সচেতন মহল ও স্থানীয়রা।
জানা গেছে, ১৯৮৬ সালের দিকে স্থানীয় বাসিন্দা আইয়ুব আলী রামদাস একটি জঙ্গলঘেরা জায়গা পরিষ্কার করতে গিয়ে মাটির নিচে চাপা পড়া প্রাচীন একটি মসজিদের সন্ধান পান। মাটি সরানোর সময় আরবি হরফে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ ও ‘৬৯ হিজরি’ লেখা একটি ইটের ইস্টক-লিপি উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে এ ঐতিহাসিক লিপিটি রংপুর তাজহাট জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর মাত্র ৫৮ বছর পর অর্থাৎ হিজরি ৬৯ সনে আরব বণিক কিংবা সাহাবিরা যাতায়াতের সময় নামাজ আদায়ের জন্য এ মসজিদটি নির্মাণ করে থাকতে পারেন। সে সেময় সেখানে বসতিও গড়ে উঠেছিল বলে মনে করা হয়। তবে সাড়ে ১৩শ বছর আগে গড়ে ওঠা সে প্রাচীন জনবসতি কীভাবে হারিয়ে গেল, তা আজও অজানা।
মসজিদ কমিটি ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীন এ মসজিদের দেয়ালের চারদিকের পুরুত্ব ৪ ফুট ২ ইঞ্চি। চুন ও সুরকি দিয়ে ইটের গাঁথুনিতে এটি তৈরি হয়েছিল। মসজিদের ভেতরে দৈর্ঘ্য ১৩ ফুট, প্রস্থ ৯ ফুট এবং ৩ ফুট ব্যাসার্ধের গোলাকৃতি মেহরাব ৪ ফুট ২ ইঞ্চির দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সে সময় এখানে মাত্র দুই কাতার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। প্রতি কাতারে সাতজন করে চৌদ্দজন ও একজন ইমামসহ ১৫ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারতেন। মসজিদের পূর্বদিকের উঠানে ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রস্থের ইট বিছানো একটি পাকা মাঠ এবং প্রবেশপথের দক্ষিণ দেয়াল ঘেঁষে তিন সিঁড়িবিশিষ্ট একটি মিম্বর অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে, যা দেখে ধারণা করা হয়, সে সময় এখানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতো।
বর্তমানে ৬৯ হিজরি হারানো মসজিদ কমপ্লেক্স ও মাদরাসাটি প্রায় ৬২ শতাংশ জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত। নবাব আলী, সামসুল আলম, আমিজান নেছা, আব্দুল হোসেন, আব্দুস সালাম ও সোলাইমান মিয়াসহ স্থানীয় ব্যক্তিদের দানে পাওয়া জমিতে এবং বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার সহায়তায় মসজিদটি একতলা ভবনে রূপান্তর করা হয়েছে। মসজিদে ১৯ কাতারে ৩১ জন করে মোট ৫৯০ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। প্রতি শুক্রবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৌতূহলী মানুষ ও পর্যটকরা এ মসজিদ দেখতে ও নামাজ পড়তে আসেন।
৬৯ হিজরি লেখা ইস্টক-লিপি পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মো. আইয়ুব আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১৯৮৬ সালের দিকে বর্তমান ৬৯ হিজরি হারানো মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্সের জায়গায় জঙ্গল ছিল। সেখানে একটি ঢিবির মতো ছিল। সে ঢিবির মাটি সরাতে গিয়ে ইস্টক-লিপিটি দেখতে পাই। দীর্ঘদিন ধরে এ মসজিদ নিয়ে গবেষণা করছেন লেখক ও সাংবাদিক চঞ্চল মাহমুদ।’ তিনি জানান, প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এর সত্যতা নিশ্চিত করা উচিত।
মসজিদটির খতিব ও মাদরাসা পরিচালক মুফতি মো. শাহাদত হুসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ মসজিদের সঠিক ইতিহাস জানার জন্য আমরা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছি। কিন্তু সরকার থেকে উদ্যোগের অভাব রয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, আরব থেকে আসা মানুষের একাধিক দল পানিপথে এ অঞ্চলে এসে ইসলাম প্রচার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে বসতি গড়ে মসজিদটি নির্মাণ করে থাকতে পারেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা মসজিদটির প্রকৃত নির্মাণকাল, বয়স ও সঠিক ইতিহাস রাষ্ট্রের মাধ্যমে জানতে চাই। একই সঙ্গে মসজিদটিকে ঐতিহাসিক হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান করছি।’
এদিকে রংপুর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ বণিক বার্তাকে জানান, উদ্ধার হওয়া ইটটি প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে পাওয়া যায়নি এবং এটি একটি ইটের ভগ্নাংশ। বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে রাসায়নিক পরীক্ষা বা কার্বন ডেটিং প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের মাধ্যমে এর সঠিক সময়কাল ও ইতিহাস নির্ধারণ করা সম্ভব।










