যশোরে গতকাল সারা দিন ৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এতে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এর আগে গত বুধবার সকাল ও দুপুরে দু’দফা ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। গতকালের বৃষ্টিতে শহরের বেশির ভাগ সড়কই পানিতে তলিয়ে যায়। এমনকি অনেকের বাড়িঘরেও পানি ঢুকেছে। ভোগান্তিতে পড়েছে পৌর শহরের দক্ষিণাংশের বাসিন্দারা। এসব বাসিন্দারা জানিয়েছে, ড্রেনের পানিপ্রবাহের পথ রুদ্ধ হওয়ায় এ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এ সংকট দূর করার জন্য কোনো ধরনের মহাপরিকল্পনা নেই পৌরসভার। ফলে ভোগান্তি নিয়েই বসবাস করছে শহরের দক্ষিণাংশের অর্ধলাখ বাসিন্দা। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, মূলত অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনার কারণে ওই এলাকার পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। 

যশোর আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গতকাল সকাল ৬ থেকে বিকাল ৬টা পর্যন্ত ৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের ১৫টি সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। আজও বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রোববার থেকে স্বাভাবিক হতে পারে আবহাওয়া।

সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অল্প বৃষ্টিতে শহরের অন্তত ১৫টি সড়কে পানি জমে গেছে। খড়কি এলাকার শাহ আবদুল করিম সড়ক, শহরের পিটিআই, নাজির শংকরপুর, খড়কি রূপকথা মোড় থেকে রেললাইন, বেজপাড়া চিরুনিকল, মিশনপাড়া, আবরপুর ক্যান্টনমেন্ট, বিমানবন্দর, ষষ্ঠীতলাপাড়ার বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ভোগে পড়েছে পথচারী ও এলাকাবাসী। এসব এলাকার বাড়িঘরেও পানি ঢুকেছে। এসব অঞ্চলের বাসিন্দারা দিনভর ভোগান্তির এমন দৃশ্য ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে পোস্ট করতে দেখা গেছে। অনেকেই সরকার ও পৌর কর্তৃপক্ষকেও সমালোচনা করে পোস্ট দিতেও দেখা গেছে। 

শহরের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শহরের ভেতর দিয়ে ভৈরব ও মুক্তেশ্বরী নামে দুটি নদ-নদী বয়ে গেছে। এর মধ্যে ভৈরব নদ দিয়ে শহরের উত্তরাংশ ও মুক্তেশ্বরী দিয়ে শহরের দক্ষিণাংশের পানি নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু গত দেড় দশক শহরের দক্ষিণাংশের পানি মুক্তেশ্বরী দিয়ে নামতে পারছে না। পয়োনিষ্কাশন নালার মাধ্যমে শহরের পানি হরিণার বিল দিয়ে মুক্তেশ্বরী নদীতে যেত। কিন্তু ২০১০ সালে হরিণার বিলে যশোর মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। এরপর আশপাশে আরো অনেক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এতে বিল দিয়ে পানি আগের মতো নিষ্কাশিত হতে পারছে না। ওই পানি বের করার জন্য খালের মাধ্যমে মুক্তেশ্বরী নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে হবে। কিন্তু পৌরসভা গত দেড় দশকেও সেই উদ্যোগ নিতে পারেনি।

শহরের পিটিআই ও বেজপাড়া চিরুনিকল এলাকায় হাঁটুপানি জমে আছে। পায়ের জুতা হাতে নিয়ে অনেককে হেঁটে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। এই এলাকার বাসিন্দা জেলা সহকারী তথ্য অফিসার এলিন সাঈদ-উর রহমান বলেন, ‘এখানে ১৫-২০ বছর ধরে জলাবদ্ধতার সমস্যা। বৃষ্টি হলে মানুষের ভোগান্তির শেষ থাকে না। অপরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ করায় শহরের পানি চলাচল বাধাগ্রন্ত হওয়ায় এ জলাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে। ঠিকমতো ড্রেন পরিষ্কার করাও হয় না বলে তিনি অভিযোগ করেন।’ 

খড়কি এলাকার শাহ আবদুল করিম সড়কের বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন, ‘১২ মাসই এ সড়কে সমস্যা থাকে। বর্ষাকালে সমস্যা দ্বিগুণ হয়। বর্ষাকালে প্রতিদিনই হাঁটুপানি থাকে। পাশেই সরকারি এমএম কলেজ। এখানকার শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ ছাত্রাবাস খড়কিতে। সড়ক এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে এখানকার মেসগুলোয় উঠতে চায় না। পৌর কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয় না।’

পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুণ্ডু বলেন, ‘ভারি বর্ষায় শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের কর্মীরা কাজ করছে, দ্রুত জলাবদ্ধতা দূর হবে।’ 

পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম শরীফ হাসান বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তবে শহরবাসীর অসচেতনতার কারণেও নালার পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। রাস্তা ও নালা সংস্কার এবং নির্মাণে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, যশোর শহরে ২৫২ কিলোমিটার পয়োনিষ্কাশন নালা (ড্রেন) রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ কিলোমিটার আরসিসি, ৬০ কিলোমিটার ইট, ৫ কিলোমিটার পাইপ ও ১৩০ কিলোমিটার কাঁচা নালা রয়েছে। এর মধ্যে নগর উন্নয়ন প্রকল্পসহ কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে গত ১৪ বছরে ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। 

এত কাজের পরও কেন জলাবদ্ধতা নিরসন হচ্ছে না জানতে চাইলে  পৌরসভার মেয়র হায়দার গণী খান পলাশ বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা কাজ করছি। মুক্তেশ্বরীর সঙ্গে সংযোগ খাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছি। ৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক।’