‘চেয়েছিলাম তিনবেলা ভালো-মন্দ খেয়ে মানুষ হবে আমার এতিম মেয়ে আমেনা খাতুন (১৩)। ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে। বয়স হলে বিয়ে দেব, তার ঘর-সংসার হবে। কিন্তু ওই বাড়ির লোকেরা খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে ঝলসে দিয়েছে হাত, পিঠসহ শরীরের অসংখ্য জায়গা।’

দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে এ কথা বলছিলেন নির্যাতিতা গৃহকর্মী আমেনার মা আকলিমা বেগম। যশোর সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের ভায়না রাজাপুর গ্রামের মৃত নুর ইসলামের মেয়ে আমেনা। একই গ্রামের একটি পরিবারের সন্তানের ঢাকার বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত আমেনা। ওই বাসার কর্ত্রী শ্যামলী ও তার স্বামী বাদল ছোট্ট মেয়েটির এ হাল করেছেন বলে অভিযোগ।

দিনের পর দিন নির্যাতনে শরীরে গুরুতর জখম নিয়ে আমেনা এখন যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

আমেনা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে জানায়, ‘আমাদের গ্রামের বাদল শিকদার সরকারি চাকরি করে ঢাকায়। বাদল তার স্ত্রী শ্যামলীকে নিয়ে ঢাকার মহাখালীতে থাকেন। তাদের ছোট একটি ছেলেকে দেখাশোনা করতে গ্রাম থেকে আমাকে নিয়ে যায়।’

‘শ্যামলী খারাপ মানুষ। সব সময় মোবাইল ফোনে কথা বলতেই থাকে। আমাকে দিয়ে সংসারের সব কাজ করায়। মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়লে সেদিন আমাকে আর খেতে দিত না। নোংরা ভাষায় গালি দিত, করত নির্যাতন। কখনো খুন্তি গরম তেলে চুবিয়ে, আবার কখনো চুলায় খুন্তি গরম করে আমার শরীরের সব জায়গায় ছ্যাঁকা দিয়েছে। হাত, পিঠ, পেটে কালশিটে দাগ হয়ে গেছে।’

লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে মেয়েটি বলে, ‘শ্যামলী প্লাস (প্লায়ার্স) দিয়ে টেনে আমার মাথার চুল তুলে ফেলেছে অনেকবার। নির্যাতনে ঢাকায় অসুস্থ হয়ে পড়ায় পরশুদিন আমার নানি ঢাকায় গিয়ে আমাকে যশোরে এনে হাসপাতালে ভর্তি করে।’

যে বাসায় আমেনা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত, সেই বাদল শিকদার অবশ্য মেয়েটির ওপর নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, ‘মেয়েটা ভালো না। ঘরের সবকিছু চুরি করে খেত। ঘর থেকে টাকা চুরি করত।’ অভিযুক্ত বাদল বলেন, ‘কীভাবে ওর (আমেনা) শরীর ঝলসে গেছে সেটা আমার জানা নেই। ‘স্থানীয় মেম্বার দায়িত্ব নিয়ে আমেনার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি মিটিয়ে দেবেন।’

যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ডাক্তার আহমেদ তারেক শামস বলেন, আমেনা নামে ১৩ বছরের একটি শিশু সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি আছে। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের অনেক চিহ্ন রয়েছে। তবে সে এখন শঙ্কামুক্ত।’

যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি আমাদের থানার মধ্যে নয়। আমি ভিকটিমের পরিবারকে থানায় আসতে বলেছি। আমরা সংশ্লিষ্ট থানাকে বিষয়টি জানাব।’