নানিয়ারচর উপজেলার হাতিমারা এলাকার চাষী সজীব চাকমা। এ বছর তার বাগানে ‘হানিকুইন’
জাতের প্রায় ২০ হাজার আনারসের চারা রোপণ করেছিলেন। আশা ছিল, মৌসুমের শুরুতে বাজারে ভালো দামে বিক্রি করতে পারবেন আনারস। কিন্তু তার সে আশা আর পূরণ হয়নি। উল্টো গত বছরের থেকেও কম দামে বিক্রি করেছেন আনারস।
শুধু সজীব চাকমাই নয় রাঙ্গামাটির পাহাড়ি এলাকার প্রায় সব আনারসচাষীর অবস্থায় একই। সম্প্রতি সদরের বনরূপা সমতাঘাটের ভাসমান পাইকার বাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। জেলার নানিয়ারচর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আনারসচাষীরা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে আনারস নিয়ে আসেন এ হাটে। সেখান থেকে স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পাইকাররা আনারস কিনে নিয়ে যান দেশের বিভিন্ন জেলায়।
আনারসচাষীরা জানান, কয়েক বছর ধরে পাহাড়ে আগাম জাতের আনারসের চাষ হচ্ছে। বাজারে চাহিদা ও দাম ভালো থাকায় প্রত্যেক বছরই আগাম আনারস চাষের পরিধিও বাড়ছে। কিন্তু এ বছর অনেক কৃষক আনারস চাষ করে লোকসানে পড়ছেন।
কৃষক সজীব চাকমা বলেন, সাপ্তাহিক (বুধবার) হাটে তিন হাজার আনারস এনেছিলাম। প্রতি পিস আনারস ১০-১২ টাকা দাম হাঁকালেও বিক্রয় করেছি মাত্র ৯ টাকায়। যেহেতু মৌসুমে আমরা ভালো দাম পাই না, তাই এখন আগাম চাষ করি। আগাম আনারসের চাহিদা রয়েছে। তাই দামও ভালো পাওয়া যায়। এ বছর কি এমন হলো যে পাইকাররা দাম দিতে চাচ্ছে না।
রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার কুতুকছড়ি থেকে আসা পুতুল চাকমা জানান, আমি এ বছর ১৫ হাজার আনারস চাষ করেছি। হাটবারে আগাম আনারসের পাইকারি বাজার দর দেখতে এলাম। বাজারে ৭-৯ টাকা দরে মাঝারি ও বড় আকারের আনারস বিক্রি হচ্ছে। ভাবছি আমিও আগামী হাটবারে এখানে আনারস আনব।
নানিয়ারচর উপজেলার মরাচেঙ্গী এলাকার চাষী রত্মবিকাশ চাকমা জানান, আগাম মৌসুমে বাড়তি দাম পাওয়ার জন্য তিন হাজার আনারস এনেছি। তবে দাম এখন কিছুটা কমে গেছে। যে আনারস আমরা আগে ২০-২৫ টাকায় বিক্রয় করতে পারতাম, সেগুলো এখন ৮-৯ টাকার বিক্রয় করতে হচ্ছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পাইকারদের বলা দামে বিক্রি করে আমাদের লোকসান দিতে হচ্ছে।
সদর উপজেলার বন্দুকভাঙা এলাকার চাষী প্রতুল চাকমা জানান, চার হাজার আনারস এনে প্রতিপিস ৭ টাকা দরে বিক্রয় করেছি। ভেবেছি আজ ১০ টাকা দরে বিক্রয় করব। এমন হলে খরচের টাকা বাদ দিলে তেমন লাভ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
পাইকার ফল ব্যবসায়ী আবুল কালাম জানান, আগাম আনারস হওয়ায় মৌসুমের চেয়ে এখন দাম বেশি পাওয়া যায়। মৌসুমে প্রতি পিস ৪-৫ টাকা কিনলেও এখন কিনতে হচ্ছে ৮-৯ টাকা দরে। আমরা এগুলো ১২-১৩ টাকা দরে বিক্রয় করি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙ্গামাটি অঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, তিন পার্বত্য জেলায় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৭ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৫৯ হাজার ২৭৭ টন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭ হাজার ৭৬৯ হেক্টর জমিতে ১ লাখ ৮১ হাজার ৯৯ টন আনারস উৎপাদন হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙ্গামাটি কার্যালয়ের উপপরিচালক কৃষ্ণ প্রসাদ মল্লিক বণিক বার্তাকে জানান, রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলায় কমবেশি আনারস চাষ হলেও নানিয়ারচর ও রাঙ্গামাটি সদরে বেশি চাষ হয়। গত মৌসুমে রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলায় ২ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে ৫৫ হাজার ৮৫০ টন আনারস উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে নানিয়ারচরে ১ হাজার ৭০ ও সদর উপজেলায় ৫৭০ হেক্টর। চলতি বছর চাষের জমি আরো বাড়বে। এখন পর্যন্ত কৃষি বিভাগের হিসাবে ৭৩০ হেক্টর জমিতে আগাম আনারস চাষ হয়েছে। মৌসুমের শেষ দিকে মোট হেক্টর জমিতে কী পরিমাণ চাষ হলো সেটি নির্ধারণ করা যাবে।
তিনি আরো বলেন, আগাম আনারস পাইকারদের কাছে তারা ৭-৮ টাকা দরে বিক্রয় করছেন। পাইকাররা বাইরে নিয়ে সে আনারস ২০-২২ টাকা দরে বিক্রি করেন।










