ভারত-অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট ম্যাচ মানেই যেন সাপে-নেউলে লড়াই। মঞ্চটা বিশ্বকাপ হলে তো কথাই নেই। গতকাল চেন্নাইয়ে দুই দলের আরেকটি ধ্রুপদি লড়াইয়ে জিতল ভারত। লো স্কোরিং ম্যাচেও ছিল স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনা। ২০০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ২ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে ফেলা ভারত শেষ পর্যন্ত ৬ উইকেটে জিতেছে বিরাট কোহলি ও লোকেশ রাহুলের বীরত্বপূর্ণ ব্যাটিংয়ে।
চিপকের ধীরগতির উইকেটে রেকর্ড পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৯ রানে অলআউট করার কৃতিত্ব দেখায় স্বাগতিকরা। জবাব দিতে নেমে দ্বিতীয় ওভারেই ইশান কিশান, রোহিত শর্মা ও শ্রেয়াস আইয়ারকে হারায় ভারত। এরপর কোহলি ও লোকেশের ২১৫ বলে খেলা ১৬৫ রানের অবিস্মরণীয় পার্টনারশিপ ভারতকে বড় লজ্জা থেকে বাঁচায়। এর মধ্যে কোহলির ৮৫, আর লোকেশের অবদান ৭৫।
কোহলি ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৮তম সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত ৮৫ রানে আউট হন জস হ্যাজেলউডের বলে। তিনি মার্নুস লাবুশেনকে ক্যাচ দেন মিড উইকেটে। ১১৬ বলের ধৈর্যশীল ইনিংসে মাত্র ৬টি বাউন্ডারি মেরেছেন ভারতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এই ব্যাটার।
কোহলি আউট হলেও লোকেশ দলকে জিতিয়ে তবেই মাঠ ছাড়েন। এই উইকেটকিপার ব্যাটার ১১৫ বলে ৮ বাউন্ডারি ও ২ ছক্কায় ৯৭ রানে অপরাজিত থাকেন। সহঅধিনায়ক হার্দিক পান্ডিয়া ৮ বলে ১১ রানে অপরাজিত থাকে। দুজন ২২ বলে ৩৪ রানের জুটিতে অবিচ্ছিন্ন থেকে দলকে জেতান। ম্যাচসেরা হয়েছেন লোকেশ।
সমাপ্তিটা মসৃণ হলেও ভারতের শুরুটা ছিল বিভীষিকাময়। ইশান কিশানকে প্রথম ওভারেই ফেরান গতিদানব মিচেল স্টার্ক। স্লিপে ক্যামেরন গ্রিনকে ক্যাচ দেন ইশান। বিশ্বকাপে এটা স্টার্কের ৫০তম শিকার। এটা বিশ্বকাপে দ্রুততম ৫০ উইকেট শিকারের রেকর্ডও। ১৯ ইনিংসে ৫০ উইকেট নিয়ে তিনি ভেঙে দেন লাসিথ মালিঙ্গার রেকর্ড। মালিঙ্গা ২৫ ইনিংসে ৫০ উইকেট শিকার করেন।
দ্বিতীয় ওভারে ভারতের ‘হিটম্যান’ খ্যাত রোহিত শর্মাকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলে ও শ্রেয়াস আইয়ারকে শর্ট কভারে ডেভিড ওয়ার্নারের ক্যাচ বানিয়ে সাজঘরের পথ দেখান আরেক পেসম্যান জস হ্যাজেলউড। ভারতের এই তিন ব্যাটারই শূন্য রানে আউট হন।
টপ অর্ডারের তিন তারার বিদায়ে চিপক তখন নিস্তব্ধ, নিশ্চুপ। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে ভারতবাসী যখন স্বপ্নে বিভোর, তখন কিনা শুরুতেই বিরাট হারের লজ্জার মুখোমুখি হওয়া! ক্রিকেট-পাগল এই দেশের লাখো মানুষ নিশ্চিতভাবেই তখন প্রার্থনায় বসে যান। ঈশ্বর তাদের নিরাশ করেননি। ভারতের বহু যুদ্ধের নায়ক কোহলি আরেকবার লড়লেন বুক চিতিয়ে। সঙ্গী হিসেবে এ যুদ্ধে পেলেন লোকেশকে। কোহলি-লোকেশের যুগলবন্দিতে হারের শঙ্কা তাড়িয়ে অবশেষে বিশ্বকাপে শুভসূচনা পেল টিম ইন্ডিয়া।
জয়ের ভিতটা গড়ে দেন বোলাররা। তিন স্পিনার নিয়ে এদিন একাদশ সাজায় স্বাগতিকরা। অভিজ্ঞ ডানহাতি অফ স্পিনার রবিচন্দ্র অশ্বিন (১/৩৪), বামহাতি অর্থোডক্স স্পিনার রবীন্দ্র জাদেজার (৩/২৮) সঙ্গে ছিলেন রিস্ট স্পিনার কুলদীপ যাদব (২/৪২)। এই ত্রয়ীর স্পিন-গরলে নীল হলো পীতবর্ণের জার্সিধারীরা। ঘূর্ণি বলের সামনে রীতিমতো অসহায় ছিল অজিরা। পেস তারকা জসপ্রীত বুমরাহও অবিশ্বাস্য বোলিং করে মাত্র ৩৫ রানের খরচায় দুটি উইকেট তুলে নেন। মোহাম্মদ সিরাজ ও পান্ডিয়ার শিকার এক উইকেট করে।
অজিদের হয়ে স্টিভেন স্মিথ সর্বোচ্চ ৪৬ রান করেন ৭১ বলের মোকাবেলায়। ডেভিড ওয়ার্নার ৫২ বলে করেন ৪১ রান। এছাড়া মিচেল স্টার্ক ২৮ ও লাবুশেন ২৭ রান করেন। দলীয় ৫ রানের সময় বুমরাহর বলে স্লিপে ক্যাচ তুলে দেন মিচেল মার্শ। এরপর দ্বিতীয় উইকেটে ওয়ার্নার ও স্মিথ ৮৫ বলে ৬৯ রান যোগ করে স্থিতি আনেন। তাদের বিদায়ে ফের বিপর্যস্ত অজিরা। কুলদীপের বলে রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন ওয়ার্নার (৭৪/২)। দলীয় ১১০ রানের সময় স্মিথ বোল্ড হয়ে যান জাদেজার ঘূর্ণিতে বিভ্রান্ত হয়ে।
এরপর ভারতীয়দের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে আসা-যাওয়ায় ব্যস্ত ছিল অজিরা। শেষ দিকে মিচেল স্টার্কের দৃঢ়তায় সংগ্রহটা দুশ ছুঁইছুঁই হয়েছে পাঁচবারের বিশ্বজয়ীদের।
এদিন ৪১ রান করে দারুণ এক মাইলফলক গড়েন ওয়ার্নার। ২২তম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে তিনি ছুঁয়ে ফেললেন ১ হাজার রানের মাইলফলক। মাত্র ১৯ ইনিংসে তিনি দ্রুততম হাজার রান করে রেকর্ড গড়েন। এই ম্যাচে মাঠে নামার আগে তার নামের পাশে ছিল ৯৯২ রান। এখন ১ হাজার ৩৩।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২২৭৮ রান সংগ্রাহক ভারতীয় কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অধিনায়ক এবি ডি ভিলিয়ার্সের দখলে ছিল এ রেকর্ড। তারা দুজনই ঠিক ২০ ইনিংসে ১ হাজার রান করেছিলেন। এবার তাদের দুজনের রেকর্ডটা নিজের করে নিলেন ওয়ার্নার।
ওয়ার্নারের রেকর্ড ভাঙার খুব কাছে ছিলেন রোহিত শর্মা। বিশ্ব আসরে ১৭ ইনিংসে ৯৭৮ রান করেছেন ভারতীয় অধিনায়ক। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ২২ রান করলেই দ্রুততম হাজার রানের মালিক হতেন তিনি। যদিও ভারতীয় দলনায়ক শূন্য রানে আউট হওয়ায় সেই সুযোগ হারান।
জয় শেষে ম্যাচসেরা লোকেশ বলেন, ‘কোহলির সঙ্গে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। তবে তিনি আমাকে বললেন, কিছুটা সময় টেস্টের মতো খেলে যাও। দলের জন্য এমন খেলতে পেরে আমি খুশি। এটা ব্যাটিংয়ের জন্য আদর্শ পিচ নয়, তবে খুব কঠিনও নয়।’
বুধবার দিল্লিতে দ্বিতীয় ম্যাচে আফগানিস্তানের মুখোমুখি হবে ভারত। পরদিন লক্ষ্ণৌতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে লড়বে অস্ট্রেলিয়া।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া: ৪৯.৩ ওভারে ১৯৯ (স্মিথ ৪৬, ওয়ার্নার ৪১; জাদেজা ৩/২৮, জসপ্রীত ২/৩৫, কুলদীপ ২/৪২)। ভারত: ৪১.২ ওভারে ২০১/৪ (লোকেশ ৯৭*, কোহলি ৮৫, হার্দিক ১১*; হ্যাজেলউড ৩/৩৮, স্টার্ক ১/৩১)। ফল: ভারত ৬ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: লোকেশ রাহুল (ভারত)।










