আর্জেন্টিনার ফুটবল দেবতা দিয়েগো ম্যারাডোনার প্রতি লিওনেল মেসির শ্রদ্ধার কথা কারো অজানা নয়। কাতার বিশ্বকাপজুড়েই তিনি দিয়েগোর উপস্থিতি অনুভব করেছেন। ডাচদের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে জয় শেষে মেসি বলছিলেন, ‘দিয়েগো স্বর্গ থেকে আমাদের দেখছেন। তিনি আমাদের ধাক্কা দিচ্ছেন এবং আমার আশা, শেষ পর্যন্ত এটি করে যাবেন।’ ২০২১ সালে অনন্তলোকের পথ ধরা ম্যারাডোনা কি সত্যিই স্বর্গ থেকে দেখেছেন মেসিদের বিশ্বজয়ের মুহূর্তটি?

মেসিদের কল্যাণে ১৯৮৬ সালের পর আর্জেন্টিনায় ফের উৎসব নেমেছে। আর্জেন্টিনার ‘পাজিনা ১২’ সংবাদপত্রে হোসে লুইস লানাও লিখেছেন, ‘আবারো বসন্ত এল’। আর্জেন্টিনার পতাকাকে তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘আকাশি নীল ও সাদা আজ খোলা আকাশে ফুটেছে যেন চেরি ফুলের মতোই।’

আরেক সংবাদপত্র ক্লারিনে সাংবাদিক হুয়ান ক্রুজ লিখেছেন, ৩৪ বছর (হবে ৩৫) বয়সে মেসি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, যে ট্রফিটি তার জন্মের আগে অদৃষ্টে লেখা হয়ে যায়।

ব্রাজিলিয়ান পত্রিকা ‘এক্সট্রা’ লিখেছে, মেসি এর যোগ্য দাবিদার—এবং আপনারাও এর সঙ্গে একমত হবেন।

ও গ্লোবো লিখেছে, ‘অমর মেসি’। নিউইয়র্ক টাইমস প্রথম পাতায় শিরোনাম লিখেছে ‘মেসি ম্যাজিক’। স্পেনের মুন্ডো দেপোর্তিভো মেসির প্রশংসা করে লিখেছে ‘ইতিহাসের সেরা’। ইনডিপেনডেন্ট লিখেছে, ‘সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। সর্বকালের সেরা ফাইনাল। সবচেয়ে মূল্যবান পুরস্কার।’ ডেইলি টেলিগ্রাফ মেসিবন্দনা করেছে তিন শব্দে: ‘মিরাকুলাস। ম্যাজিক্যাল। মেসি।’

ইংলিশ গ্রেট গ্যারি লিনেকার ফাইনালের আগে বলছিলেন, মেসি যা করেছেন তাতে বিশ্বকাপ না জিতলেও তাকে মানুষ মনে রাখবে, তার অভাব অনুভব করবে।

কিন্তু শিরোপাটি যে বড্ড প্রয়োজন ছিল এলএম১০-এর। অবশেষে তিনি সেই স্বাদ পেয়েছেন।

লুসাইলে আর্জেন্টিনার মহাকাব্যিক জয়ের পর উঠে আসছে সেই পুরনো প্রসঙ্গ। ম্যারাডোনা নাকি মেসি সেরা? এ নিয়ে আর্জেন্টাইন ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে তর্কটা বহুদিনের। তবে কিংবদন্তি ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব কিনা, সেই তর্কটা তোলাই থাক। বিশ্বকাপ জিতে তার পাশে বসার সুযোগটা অন্তত মেসির ছিল। সাতটি ব্যালন ডি’অর, অলিম্পিকে সোনার পদক, বার্সেলোনার হয়ে ১০ বার লিগ শিরোপা ও চারবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা, ক্লাব বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন—১৮ বছরের ফুটবল ক্যারিয়ারে সবই পেয়েছেন মেসি। ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে শুধু অধরা ছিল বিশ্বকাপ ট্রফি। সেই অপূর্ণতাও ঘুচল ফুটবলের এই মহারাজার, ফুটবলের এই দেবদূতের।

আর্জেন্টিনা ও সারা ফুটবল দুনিয়ার অনেকেই এখন মেসিকে সেরার আসনে বসাচ্ছেন। যদিও দুজন দুটি ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন পরিস্থিতিতে খেলেছেন। কিন্তু দুজনই ছিলেন দলের আস্থার নাম, দলনায়ক আর জাতির আশা-ভরসার প্রতীক। ছিয়াশিতে অনেকটাই একক নৈপুণ্য প্রদর্শন করে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দিয়েছেন ম্যারাডোনা। মেসিও ছিলেন আর্জেন্টিনার কাণ্ডারি। ব্রাজিলের মাটিতে অল্পের জন্য ব্যর্থ হন। হয়তো তার অদৃষ্টে কাতারের নামটিই লেখা ছিল। তাই হূদয় দিয়ে খেললেন এবার। গোল করলেন, করালেন, আর মুহূর্তের ম্যাজিকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখলেন ফুটবল দুনিয়াকে। সেই সঙ্গে নেতৃত্বগুণেও পুরো দলটাকে বেঁধে রাখলেন এক সুতোয়। সর্বশেষ বিশ্বকাপে এমন অলরাউন্ড নৈপুণ্য দেখাতে পেরেছেন  একজন—দিয়েগো ম্যারাডোনা।

এ ট্রফি সহজে আসেনি, প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে হেরে মনোবল দুমড়েমুচড়ে যাওয়ার পরও ছাইভষ্ম থেকে ফিরে আসা মেসিদের। ধীরে ধীরে ছন্দ ফিরে পাওয়া। ‘নাউ অর নেভার’ কথাটি সবসময়ই চাপে রেখেছে মেসিকে। এ চাপের মধ্যেই সেরাটা বেরিয়ে আসতে থাকে তার। গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে ফাইনাল—আর্জেন্টিনার জয় মানেই মেসির গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিলই। তিনি হয় গোল করেছেন কিংবা গোল তৈরি করে দিয়েছেন।

কাতারে সাত গোল করা মেসি অ্যাসিস্টও করেন তিনটি। তবে তার দু-একটি মুভ যেন সমর্থকদের জন্য নিয়ে আসে স্বর্গীয় সুধা। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে হুলিয়ান আলভারেজকে দিয়ে গোল করানোর আগে মেসির মুভ, ডামি করা, গতির দৌড়ে জোসকা গার্দিওলকে পেছনে ফেলা ও টাচলাইন থেকে যে পাসটি বাড়ান মেসি তা নিয়ে ধারাভাষ্যকার ভিক্টর হুগো মোরালেস বলছিলেন, ফুটবল শিল্পের এক দাস যেন। তার একটি মুভেই খেলাটির গোটা সৌন্দর্যের প্রদর্শনী হয়ে গেল। ফুটবলের শাশ্বত, অসীম এক যোদ্ধা, আলাদিন। অবিশ্বাস্য।

১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলে আর্জেন্টিনা। সেবার উরুগুয়ের কাছে ফাইনালে হেরে যায় আলবিসেলেস্তেরা। এরপর দ্বিতীয়বার ফাইনালে উঠতে ৪৮ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের। ১৯৭৮ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত আসরের ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপার স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা। সেই বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক ছিলেন মারিও কেম্পেস।

ততদিনে এসে গেছেন ম্যারাডোনা। আটাত্তরে তাকে না নেয়ায় বিতর্ক কম হয়নি। পরের আসরে ম্যারাডোনা খেললেও আর্জেন্টিনার বিদায় ঘটে দ্বিতীয় রাউন্ডেই। এরপর ছিয়াশিতে ম্যারাডোনার উত্থান। তার নেতৃত্বে, তার বীরত্বে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। ওই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার হাত দিয়ে করা গোলটি নিন্দিত ও নন্দিত হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। সেটি ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল নামেই খ্যাতি পায়।

এরপর ৩৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। তবে এ সময় ম্যারাডোনার যোগ্য উত্তরসূরি পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ফুটবলের মহারাজা লিওনেল মেসি। তিনি আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ এনে দেয়ার মিশনে সেনাপতি হিসেবে বারবার যুদ্ধের ময়দানে নেমে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসতে থাকেন। ২০১৪ সালে ব্রাজিল আসরে তো চলে যান হাতছোঁয়া দূরত্বে।

আর্জেন্টিনা যখন সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল তখন মেসির জন্মও হয়নি। আজ থেকে ৩৬ বছর আগে ম্যারাডোনার হাত ধরে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয় আর্জেন্টিনা। এরপর ১৯৯০ ও ২০১৪ সালে কাছাকাছি গিয়েও হয়নি। শিরোপার অপেক্ষা বাড়তে থাকে আর্জেন্টাইনদের। অবশেষে সেই মেসিই ত্রাতা হয়ে তৃতীয় মুকুট এনে দিলেন আর্জেন্টিনাকে।

১৯৮৭ সালে রোজারিওতে জন্ম মেসির। তার পরের বছর ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও অ্যাজটেকায় বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও পশ্চিম জার্মানি। ১ লাখ ১৪ হাজারেরও বেশি দর্শকের সমনে তুমুল লড়াই শেষে ৩-২ গোলে জয় তুলে নেয় আর্জেন্টিনা।

রোববার কাতারের লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে যেন ফিরে এল অ্যাজটেকা। এদিনও ছিয়াশির মতো ২-০ গোলের লিড নেয় আর্জেন্টিনা। চিতার মতোই ক্ষিপ্রতা নিয়ে খেলা কিলিয়ান এমবাপ্পে দুই মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে সমতা আনেন। এরপর আরো একবার আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় ও ফ্রান্স সমতা আনে। শেষ অংকে টাইব্রেকারের রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তায় জয় পায় আর্জেন্টিনা। প্রথমবারের মতো মেসির হাতে ওঠে বিশ্বকাপ ট্রফি।

এবারের শিরোপা সাফল্যের পর ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা হিসেবে মেসিকে স্বীকৃতি দিতে সব বিতর্ক আর সংশয়েরও যেন অবসান হলো।

এর আগের ‘গ্রেট অব অল টাইম’ মেসিরই স্বদেশী ম্যারাডোনা। তারও আগে ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে। পেলে ও ম্যারাডোনা দুজনেরই ছিল অবিশ্বাস্য পেশাদার ক্যারিয়ার। যদিও বিশ্বকাপই ছিল তাদের প্রথম ট্রফি। কিন্তু মেসির সব ট্রফি আর অর্জন সহজেই ওই দুজনকে পেছনে ফেলে দেবে। রোববার রাতের অর্জনে সাতটি ব্যালন ডি’অরজয়ীর শোকেসটা এখন পরিপূর্ণ হলো।

বিশ্ব চ্যাম্পয়ন মেসিকে অভিনন্দন জানিয়ে পেলে ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছেন, ফুটবল আজ তার গল্প বলে গেল, সবসময়ের মতোই চিত্তাকর্ষক উপায়ে। মেসি তার প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছে, আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে। আমার বন্ধু এমবাপ্পে, ফাইনালে করল চার গোল। আর্জেন্টিনাকে অভিনন্দন। নিশ্চিতভাবেই দিয়েগো এখন হাসছে।