গতবার ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ আসরে প্রথম দল হিসেবে ৯ ম্যাচ খেলে সবগুলোতেই হারের লজ্জা পায় আফগানিস্তান। ২০১৫ সালে অভিষেক আসরে শুধু স্কটল্যান্ডকে হারাতে পেরেছে তারা। সেই আফগানরা এবার ভারতের মাটিতে রূপকথা লিখে চলেছে। ১৫ অক্টোবর দিল্লিতে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে হারানোর পর গতকাল চেন্নাইতে আরেকবার উড়ল আফগান পতাকা। বিশ্বকাপে তো বটেই, ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথমবার তারা পাকিস্তানকে হারের স্বাদ দিল। 

এর আগে টানা দুই জয়ের পর টানা দুই ম্যাচে হেরেছে পাকিস্তান। সেমির রেসে ফিরতে জিততে মরিয়া ছিল তারা। চেন্নাইয়ের চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানকে ২৮৩ রানের টার্গেট ছুড়ে দিয়ে হয়তো জয়ের কথাই ভাবছিল বাবর আজমের দল। কিন্তু প্রতিবেশী ক্রিকেট শক্তিকে অবাক করে দিল অদম্য আফগানরা। রান তাড়া করতে নেমে ৬ বল বাকি থাকতে ৮ উইকেটের বিশাল জয় তুলে নেয় হাশমতউল্লাহ শহিদির দল। প্রতিবেশী দেশটিকে প্রথমবারের মতো হারিয়ে আনন্দে মাতোয়ারা আফগান ক্রিকেটার ও সমর্থকরা। জয়শেষে আফগানিস্তানের পতাকা নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন শহিদি, রশিদ খান, মোহাম্মদ নবিরা।  

টস জিতে ব্যাটিং নেয়া পাকিস্তান আব্দুল্লাহ শফিক ও বাবর আজমের ফিফটির পর শাদাব খান (৪০) ও ইফতিখার আহমেদের (৪০) ব্যাটে ভর করে ৭ উইকেটে ২৮২ রান তুলতে সমর্থ হয়। জবাব দিতে নেমে রহমানুল্লাহ গুরবাজ (৬৫) ও ইব্রাহিম জাদরান (৮৭) ওপেনিং জুটিতে আফগানিস্তানকে ২১ ওভারেই এনে দেন ১৩০ রান। গুরবাজ ৫৩ বলে ৬৫ রান করে শাহিন শাহ আফ্রিদির শিকার হন। 

দ্বিতীয় উইকেটে জাদরান ও রহমত শাহ দারুণ ব্যাটিংয়ে বোর্ডে ৭৪ বলে ৬০ রান যোগ করেন। ১১৩ বলে ১০ বাউন্ডারিতে ৮৭ রানের ইনিংস খেলে হাসান আলীর শিকার হন জাদরান (১৯০/২)। তখন খানিকটা আশা জাগে পাকিস্তানের। যদিও হারিস রউফ, শাহিন শাহদের হতাশ করতে থাকেন রহমত শাহ ও অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শহিদি। এই জুটি ৯৩ বলে ৯৬ রান করে পাকিস্তানের সব আশা শেষ করে দেয়। রহমত ৮৪ বলে ৭৭ ও শহিদি ৪৫ বলে ৪৮ রান করে অপরাজিত থাকেন। 

এই ম্যাচে আফগানিস্তান দলে পেসার ফজলহক ফারুকির জায়গায় আসেন স্পিনার নূর আহমাদ। ফলে আফগান বোলিং অ্যাটাক সাজানো হয় চার স্পিনার নিয়ে। সিদ্ধান্তটা দারুণ কার্যকর হলো। 

বিশ্বকাপ অভিষেকেই চমক দেখিয়েছেন নূর আহমাদ। ১৮ বছর বয়সী এই বামহাতি রিস্ট স্পিনার পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের বড় ক্ষতিটা করেন। তিনটি উইকেট নেন তিনি। 

আজমতউল্লাহ ওমরজাই ৫৬ রানের সময় ইমাম-উল-হককে ফিরিয়ে ওপেনিং জুটি ভাঙেন। আব্দুল্লাহ শফিক ও বাবর আজম যখন দলকে সংহত অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই নূর আহমাদের জোড়া আঘাত। তিনি পরপর আউট করেন শফিক (৭৫ বলে ৫৮) ও মোহাম্মদ রিজওয়ানকে (১০ বলে ৮)। 

এরপর সৌদ সাকিলকে নিয়ে ৪৩ ও শাদাব খানকে নিয়ে সমান ৪৩ রানের দুটি জুটি গড়েন বাবর। সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগানো বাবরকে (৯২ বলে ৭৪) সাজঘরে ফেরান নূর। তার বলে এক্সট্রা কভারে নবিকে ক্যাচ দেন পাকিস্তান দলনায়ক।  

বাবরের বিদায়ের পর পাকিস্তানের স্কোর আড়াইশ হবে কিনা তা নিয়েই ছিল সংশয়। তখন ষষ্ঠ উইকেটে ইফতিখার ও শাদাব ৪৫ বলে ৭৩ রান যোগ করে ড্রেসিংরুমে স্বস্তি ফেরান। এর মধ্যে ইফতিখারই ছিলেন বেশি মারমুখী। তিনি ২৭ বলে ২ চার ও ৪ ছক্কায় ৪০ রান করে নবীন-উল-হকের শিকার হন। ৩৮ বলে ৪০ রান করা শাদাব খান ইনিংসের শেষ বলে আউট হন। 

৪৯ রানে তিন উইকেট নেন নূর আহমাদ। এছাড়া নবীন ৫২ রানে দুটি এবং আজমত ও নবি একটি করে উইকেট নেন।

জয়শেষে দলের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য ও সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ নবি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘আফগানিস্তানের জন্য ঐতিহাসিক এক মুহূর্ত। পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা আটবার খেলেছি, জিতলাম এবার বড় আসরে। আজ এটা দারুণ মুহূর্ত। আমরা ইংল্যান্ডকেও হারিয়েছি, এবার পাকিস্তান। দল এখন অনেক আত্মবিশ্বাসী। বাংলাদেশের কাছে আমাদের ম্যাচটি হারা উচিত হয়নি।’

৩০ অক্টোবর পুনেতে শ্রীলংকার বিপক্ষে খেলবে আফগানিস্তান। আর সেমিফাইনাল অনিশ্চিত হয়ে পড়া পাকিস্তান ২৭ অক্টোবর চেন্নাইতেই দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে।

এই জয়ে টেবিলের তলানি থেকে এক লাফে ষষ্ঠ স্থানে উঠে গেল আফগানিস্তান। ৫ ম্যাচে তাদের সংগ্রহ ৪, পাকিস্তানও সমান পয়েন্ট নিয়ে পাঁচে অবস্থান করছে। শীর্ষ চারে আছে ভারত, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া। সপ্তম স্থানে থাকা বাংলাদেশের ঝুলিতে ৪ ম্যাচে ২ পয়েন্ট। আজ তিনে থাকা প্রোটিয়াদের মুখোমুখি হবে সাকিব আল হাসানের দল। 

সংক্ষিপ্ত স্কোর

পাকিস্তান: ৫০ ওভারে ২৮২/৭ (বাবর ৭৪, শফিক ৫৮, শাদাব ৪০, ইফতিখার ৪০; নূর ৩/৪৯, নবীন ২/৫২)। আফগানিস্তান: ৪৯ ওভারে ২৮৬/২ (জাদরান ৮৭, রহমত ৭৭*, গুরবাজ ৬৫, শহিদি ৪৮*; হাসান আলী ১/৪৪)। ফল: আফগানিস্তান ৮ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: ইব্রাহিম জাদরান (আফগানিস্তান)।