স্থানীয়রা শিশু দুটিকে বাঁওড় থেকে উদ্ধার করে কেশবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
এভাবে প্রতিদিন দেশে পানিতে ডুবে গড়ে ৩০টি শিশুর মৃত্যু হয়, যাদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। গত চার বছরে মারা গেছে ৪ হাজার ৮৬৭ শিশু। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ৭১৩ শিশু শুধু পানিতে ডুবে মারা গেছে। গড়ে প্রতি মাসে মারা গেছে ১০২টি। আগস্ট শেষে এ সংখ্যা আরো বাড়বে।
দেশে শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান রাখা ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পানিতে ডুবে মারা গেছে ৭১৩ শিশু। ২০২৫ সালে মারা যায় ১ হাজার ১৮৪ শিশু। এসব শিশুর বয়স এক থেকে ১০ বছর। শিশুমৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে সকাল ৭টা থেকে বেলা ১১টা মধ্যে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ২০২২ থেকে ২০২৫ সালে বাস্তবায়ন করেছে ‘ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি-বেজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রটেকশন অ্যান্ড সুইম-সেফ ফ্যাসিলিটিজ (আইসিবিসি)’ প্রকল্প। ৩০৬ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় ১৬ জেলার ৪৫টি উপজেলায় আট হাজার শিশু যত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। সেখানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় দুই লাখ শিশুকে দেখাশোনার পাশাপাশি ১ হাজার ৬০০টি সুইম-সেফ কেন্দ্রের মাধ্যমে ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী আরো প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানো হতো। তবে ডিসেম্বরের পর থেকে এসব কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়।
সরকারি কেন্দ্রগুলো সন্তানদের নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। নতুন প্রকল্পের অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত এটি চালু হচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
আইসিবিসি প্রকল্পের পরিচালক তারিকুল ইসলাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রথম ধাপের প্রকল্প শেষ হওয়ায় কার্যক্রম আপতত বন্ধ। যেসব উপজেলায় পানিতে ডুবে বেশি শিশু মারা যেত, সেখানে এটি কার্যক্রম চালায়। সেখানে নির্দিষ্ট কেয়ার গিভার ছিলেন, তারা শিশুদের দিনের নির্দিষ্ট সময় পরিচর্যা করতেন এবং সাঁতার শেখাতেন। সরকারি অর্থায়ন ও দেশী-বিদেশী বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছিল। কিন্তু প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আমরা সারা দেশের জন্য একটি প্রকল্প নিচ্ছি। যার ব্যয় ৮৩৮ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সারা দেশে ১৩ হাজারের বেশি শিশু যত্ন কেন্দ্র চালু হবে। শিশু যত্ন ও সুইম-সেফ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ ৬ হাজার শিশুকে সেবা দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে অনুসারে, দেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে প্রায় ১৮ হাজার ৬৬৫ জন। প্রতিদিন গড়ে মারা যায় ৫১ জন। তার মধ্যে ১৪ হাজার ২৬৯ জনই শিশু—অর্থাৎ ৭৫ শতাংশের বেশি। শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে এক থেকে চার বছর বয়সীরা। ডুবে মৃত্যুর ৭০ শতাংশই ঘটছে বাড়ির পাশে থাকা পুকুরে। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় ৮ দশমিক ৯ জনের।
দেশে শিশুমৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি হয় পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা ও বরগুনা এলাকায়। নদী ও উপকূলবেষ্টিত এসব অঞ্চলে আইসিবিসি প্রকল্পের আওতায় সবচেয়ে বেশি শিশু যত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হলেও তা কাজে আসেনি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্যমতে, চলতি আগস্টে ৩৬ শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, ভোলা ও পটুয়াখালীতে সবচেয়ে বেশি।
আইসিবিসি প্রকল্প চলাকালে এসব এলাকায় শিশুমৃত্যু কমানো গিয়েছিল বলে দাবি করেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, এ কেন্দ্রগুলোতে নিবন্ধিত কোনো শিশুর ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। শিশুদের বিকাশেও এ কেন্দ্রগুলোর ইতিবাচক প্রভাব ছিল। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের-২০২৫ সালের এক মূল্যায়নে দেখা যায়, এসব কেন্দ্রে যাওয়া শিশুদের ভাষা, চলাফেরা ও আত্মবিশ্বাসের বিকাশ তুলনামূলক ভালো হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও ডিজাস্টার অ্যাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (দাদু) প্রধান নির্বাহী মো. ইদ্রিস আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশুমৃত্যু নীরবে ঘটে যাচ্ছে। এটি কমাতে হলে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে, দ্রুত রেসকিউ করা, কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) সম্পর্কে ধারণা দেয়া এবং সাঁতার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সেটা না করে যদি শিশুসেবা যত্ন কেন্দ্র করে সাত বছরের শিশুকে সাঁতার শেখানো, নির্দিষ্ট কেয়ার গিভার দিয়ে পরিচর্যা করা হয় তাহলে কিন্তু হবে না।’
পানি ডুবে শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে বলে জানান বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালক আরজু আরা বেগম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু কমিয়ে আনতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের সচেতনতা বাড়ানো। সেজন্য সরকার স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করছে।’










