মুম্বাইয়ে গতকাল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৮৩ রানের বিশাল টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ৮১ রানে ৬ উইকেট নেই বাংলাদেশের! এরপর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের প্রাণপণ লড়াই বাংলাদেশকে এনে দেয় ২৩৩ রান। তার তৃতীয় বিশ্বকাপ সেঞ্চুরিতেও (১১১) অবশ্য বড় হার এড়ানো যায়নি। কুইন্টন ডি ককের বীরত্বপূর্ণ সেঞ্চুরির কাছেই হেরে গেল বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত সাকিব আল হাসানদের হার ১৪৯ রানের। চলতি বিশ্বকাপে চতুর্থ হারের স্বাদ পেল বাংলাদেশ।
ওপেনিংয়ে ব্যাট করতে নেমে ১৭৪ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলে বাংলাদেশের সব আশা শেষ করে দেন বামহাতি হার্ড হিটার ডি কক। তিনি চলতি আসরে নিজের তৃতীয় সেঞ্চুরি করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৩৮২ রানের বিশাল সৌধ গড়ে দেন। বিশ্বকাপে এটা বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর। আগের সর্বোচ্চ স্কোর ছিল অস্ট্রেলিয়ার। ২০১৯ বিশ্বকাপে নটিংহ্যামে ৫ উইকেটে ৩৮১ রান তুলেছিল অজিরা। গতকাল সেই স্কোর ছাড়িয়ে গেল দক্ষিণ আফ্রিকা (৩৮২/৫)।
ওয়ানডেতে এটি বাংলাদেশের বিপক্ষে পঞ্চম সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। গত বছর চট্টগ্রামে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৮ উইকেটে ৪০৯ রান তুলেছিল ভারত। সেটাই ওয়ানডেতে বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বোচ্চ এবং একমাত্র ৪০০ ছাড়ানো দলীয় সংগ্রহ।
বিশাল টার্গেট তাড়া করতে নেমে ৮১ রানে ৬ উইকেট হারানো বাংলাদেশ মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরির কল্যাণে বড় লজ্জা থেকে বাঁচে। ১১১ বলে ১১টি চার ও ৪টি ছক্কায় ১১১ রান করেন তিনি। যদিও দলের অন্য কেউ তাকে যোগ্য সঙ্গ দিতে পারেননি।
চলতি আসরে এটা পাঁচ ম্যাচে চতুর্থ হার বাংলাদেশের। আফগানিস্তানকে হারানোর পর টানা হেরেছে ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে। শনিবার কলকাতায় নেদারল্যান্ডসের কাছে হারলেই বিদায় নিশ্চিত হয়ে যাবে। অন্যদিকে প্রোটিয়ারা পাঁচ ম্যাচের চারটিতে জিতে নিউজিল্যান্ডকে তিনে ঠেলে দিয়ে উঠে গেল পয়েন্ট টেবিলের দুইয়ে। সেমিফাইনালের পথেও বড় এক ধাপ এগিয়ে গেল কখনই বিশ্বকাপ না-জেতা এ দলটি।
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড ম্যাচে ঝড় তোলেন ক্লাসেনসহ দলের আরো তিনজন। সেঞ্চুরি করে ক্লাসেন ছিলেন সবার সেরা। সেই একই মাঠে গতকাল ঝড় উঠল ডি ককের ব্যাটে। ১০১ বলে তিন অংক ছুঁয়েছেন ৬ চার ও ৪ ছক্কার সাহায্যে। আউট হয়েছেন ১৪০ বলে ১৫টি চার ও ৭ ছক্কার সাহায্যে। এরপর ক্লাসেন (৪৯ বলে ৯০) ও ডেভিড মিলারের (১৫ বলে ৩৪*) ব্যাটে ভর করে অবিশ্বাস্য গতিতে রান ৩৮২-তে নিয়ে যান।
শ্রীলংকার বিপক্ষে ৪২৮ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩৯৯ রানের সৌধ গড়া প্রোটিয়ারা ডেথ ওভারে আরেকবার ঝড় তুলল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে শেষ ১০ ওভারে ১৪৩ রান তোলার পর বাংলাদেশের বিপক্ষে তারা তুলল ১৪৪ রান। তার মানে, গত দুই ম্যাচে শেষ ২০ ওভার থেকে তারা মোট তুলেছে ২৮৭ রান! ব্যাটিং পাওয়ার প্লেতে কাল প্রোটিয়াদের সংগ্রহ ছিল ৪৪/২। আর ৪০ ওভার শেষে স্কোরটা ২৩৮/৩। সেখান থেকে প্রোটিয়াদের স্কোর গিয়ে ঠেকল ৩৮২ রানে!
১৫ বলে চার ছক্কায় ৩৪ রান করা ডেভিড মিলার প্রথম ইনিংস শেষে বলেন, ‘বল খুব ভালোভাবে ব্যাটে আসছিল। শীর্ষ ছয়জন তাদের ভূমিকা সম্পর্কে জানে। ছেলেরা অবিশ্বাস্যভাবে ভালো খেলছে এবং এমনটা দেখতেও ভালো লাগে।’
চলতি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ তিনটি সেঞ্চুরির মালিক এখন ডি কক। এছাড়া একটি করে সেঞ্চুরি আছে আরো ১৬ জনের। গতকাল এ তালিকায় নিজের নাম লেখান বাংলাদেশের মাহমুদউল্লাহও। মাহমুদউল্লাহ ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে দুটি সেঞ্চুরি করে ইতিহাস গড়েন। তিনিই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম সেঞ্চুরিয়ান। এরপর ২০১৯ আসরে সাকিব দুটি ও মুশফিকুর রহিম একটি সেঞ্চুরি করেন। এবার মাহমুদউল্লাহ করলেন দেশের হয়ে বিশ্বকাপে ষষ্ঠ সেঞ্চুরি।
এর আগে শ্রীলংকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেন ডি কক। গতকাল তৃতীয় সেঞ্চুরি আদায় করে নিলেন তিনি বাংলাদেশের বিপক্ষে। ১৫০তম ওয়ানডে ম্যাচে এটা তার ২০তম সেঞ্চুরি। এছাড়া টেস্টে ছয়টি ও আন্তর্জাতিক টি২০-তে একটি সেঞ্চুরি করেছেন ডি কক।
এটা ডি ককের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ওয়ানডে স্কোর। ২০১৬ সালে সেঞ্চুরিয়নে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৭৮ রানের ইনিংস খেলার কীর্তি আছে তার। বিশ্বকাপে এটা বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর। ২০১১ সালে মিরপুরে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৭৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন ভারতের ওপেনার বিরেন্দর শেবাগ। আর সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ ইনিংস। গত বছর চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২১০ রান করেন ভারতের ইশান কিশান।
এর আগে টস জিতে ব্যাট নেয়া দক্ষিণ আফ্রিকার দুই উইকেটের পতন ঘটে ৩৬ রানের মধ্যে। সপ্তম ওভারের প্রথম বলে রিজা হেনড্রিকসকে বোল্ড করেন পেসার শরিফুল ইসলাম। পরের ওভারে রাসি ফন ডার ডুসেনকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ।
তৃতীয় উইকেটে অধিনায়ক মার্করাম ডি কককে নিয়ে ১৩১ রানের জুটি গড়েন। মার্করামকে ফেরান সাকিব আল হাসান। লং-অফে লিটন দাসকে ক্যাচ দেন (৬৯ বলে ৬০ রান)। বিপজ্জনক জুটিতে ডি কক ও হাইনরিখ ক্লাসেন ৮৭ বলে ১৪২ রান যোগ করেন। ডেথ ওভারে ২৫ বলে ৬৫ রানের জুটিতে দলের সংগ্রহটা চারশর কাছাকাছি নিয়ে যান ক্লাসেন ও ডেভিড মিলার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
দক্ষিণ আফ্রিকা: ৫০ ওভারে ৩৮২/৫ (ডি কক ১৭৪, ক্লাসেন ৯০, মার্করাম ৬০, মিলার ৩৪*; হাসান ২/৬৭)। বাংলাদেশ: ৪৬.৪ ওভারে ২৩৩/১০ (মাহমুদউল্লাহ ১১১, লিটন ২২, নাসুম ১৯; কোয়েৎজি ৩/৬২, ইয়ানসেন ২/৩৯, রাবাদা ২/৪২, উইলিয়ামস ২/৫৬)। ফল: দক্ষিণ আফ্রিকা ১৪৯ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: কুইন্টন ডি কক (দক্ষিণ আফ্রিকা)।










