দেশের অন্যতম আমের মোকাম রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বরে উঠেছে প্রচুর আম। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের কারণে ক্রেতা নেই। ফলে বাজারে দাম নেই আমের। এতে খরচও উঠছে না আমচাষী ও বাগান মালিকদের।

চাষীদের ভাষ্য, এ মুহূর্তে বাজারে আমের সরবরাহ প্রচুর। করোনার কারণে বাইরের ক্রেতা না আসায় স্থানীয় ক্রেতারা কিছু আম কিনে বাইরে পাঠাচ্ছেন। এতে আমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না চাষী ও ব্যবসায়ীরা। ক্রেতা না থাকায় লাভ তো দূরের কথা, আম পাড়া ও বাজারজাতের খরচই উঠছে না। গতকাল সরেজমিনে বানেশ্বর আমের হাট ঘুরে দেখা গেছে ক্রেতাদের হাহাকার।

করোনার কারণে আগের জায়গা থেকে আমের হাট সরিয়ে নিয়ে বসানো হয়েছে বানেশ্বর সরকারি কলেজ মাঠে। সকাল থেকেই ভ্যান ও ভটভটিতে করে আম নিয়ে বাজারে আসেন স্থানীয় আমচাষী ও বাগান মালিকরা। রাজশাহী জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আম আনেন বিক্রেতারা। পাশের জেলা নাটোর থেকেও আম এসেছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজার ভরা হিমসাগর বা ক্ষীরসাপাতি আমে। ২৫ মে থেকে এ জাতের আম নামছে। একই তারিখ থেকে বাজারে আসছে লক্ষ্মণভোগ বা লখনা আম। এখন প্রায় শেষের দিকে গোপালভোগ। নতুন করে নামতে শুরু করেছে ল্যাংড়া।

যদিও প্রশাসনের বেঁধে দেয়া সময়সীমা অনুযায়ী, ল্যাংড়া নামার কথা ৬ জুন থেকে। ১৫ জুন থেকে নামবে আম্রপালি ও ফজলি। মৌসুমের শেষে ১০ জুলাই নামতে শুরু করবে আশ্বিনা ও বারি আম-৪। এছাড়া রঙিন আম খ্যাত বারি আম-১৪ নামবে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে।

বাজারে প্রতি মণ গোপালভোগ বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গোপালভোগের বাজার চড়া। তবে হিমসাগর মিলছে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা দরে। আর ল্যাংড়া বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকায়। লক্ষ্মণভোগ বা লখনা বিক্রি হচ্ছে গুটির দরে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। বাজারে রয়েছে কিছু গুটিজাতের আম। সেগুলো বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা মণ দরে।

এ দামে খুশি ক্রেতারা। তবে খুশি নন আমচাষী ও বাগান মালিকরা। জেলার পুঠিয়ার জামিরা এলাকা থেকে বানেশ্বর হাটে আম বিক্রি করতে এসেছিলেন বাগান মালিক শাহ মোহাম্মদ। বাজারে আমের দাম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে তার। তিনি জানান, বাজারে গত বছরের চেয়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা কমে রকম ভেদে প্রতি মণ আম বিক্রি হচ্ছে। এতে চাষী ও বাগান মালিক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। করোনার কারণে ক্রেতা না থাকায় এ সংকট।

একই ভাষ্য বানেশ্বরের কাপাসিয়া এলাকার আমচাষী আবুল কাশেম। আমহাটের প্রবেশমুখে ভ্যান ভর্তি ৫০ ক্যারেট ক্ষীরসাপাতি আম রেখে পাশের গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। চোখে মুখে তার হতাশার ছাপ।

একই গাছের ছায়ায় বিরাম নিচ্ছিলেন জেলার দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর এলাকার আরেক আমচাষী রফিকুল ইসলাম। তার আমবাগান রয়েছে ৫০ বিঘার মতো। তিনিও জানালেন আমের হাটে ক্রেতা সংকটের কথা। তবে গাছ থেকে তিনি আর আম নামাচ্ছেন না।

বাজারে বাড়তি আম নেয়া রেওয়াজে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষী বানেশ্বরের আশরাফুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, আড়তদাররা প্রতি মণ ওজনে নিচ্ছেন ৪৮ কেজি। বাড়তি এ আট কেজির দাম পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছর তারা ৪৬ কেজিতে মণ ধরেছিলেন। এবার বাড়িয়েছেন।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন আমের হাটের ইজারাদার উসমান আলী। তিনি জানিয়েছেন, বাড়তি ওজন যেন কেউ না নেন বা দেন সেজন্য মৌসুমের শুরুতে সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

সর্বসম্মতিক্রমে নেয়া এ সিদ্ধান্ত পরে সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এখনো এ সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ওজনের অতিরিক্ত আম দিয়েছেন এমন কেউ অভিযোগও দেননি। ফলে কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়নি।