যশোরে বাস ও ইজিবাইকের সংঘর্ষে নিহত সাতজনের মধ্যে পাঁচজন একই পরিবারের সদস্য। এ দুর্ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া পাঁচ বছর বয়সী শিশু খাদিজা আহতাবস্থায় যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাসচাপায় প্রাণ গেছে তার দুই জমজ ভাই, নানি, খালা আর খালাতো বোনের। এ ঘটনায় তার মা এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। সে এখনো জানে না তার দুই ভাইসহ ইজিবাইকে থাকা স্বজনের কেউ বেঁচে নেই।

এদিকে দুর্ঘটনায় নিহত সাতজনের দাফন গতকাল সম্পন্ন হয়েছে। বাঘারপাড়ার যাদবপুরে স্থানীয় একটি বিদ্যালয় মাঠে তিনজন, সেকেন্দারপুর গ্রামে দুজন, মথুরাপুর গ্রামে একজন এবং সদর উপজেলার সুলতানপুরে একজনের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়েছে। এর আগে তাদের জানাজায় ঢল নামে শোকার্ত মানুষের। একসঙ্গে এত প্রাণ ঝরে যাওয়ায় এলাকা শোকে স্তব্ধ।

গতকাল দুপুরে যশোর জেনারেল হাসপাতালের মহিলা সার্জারি ওয়ার্ডে দেখা গেছে আহত শিশু খাদিজা চাচার কোলে শুয়ে আছে হাসপাতালের বিছানায়। তার শরীরের ক্ষত ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। তবে তার মন ভালো নেই। ছোট্ট মেয়েটি এখনো জানে না, সে ভয়াল দুর্ঘটনা চিরতরে কেড়ে নিয়েছে তার সব আপনজনকে। স্বজনরা তাকে বলছেন, সবাই ভালো আছে, দু-একদিন পরই দেখা হবে। মিথ্যা সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কেঁপে উঠছে তাদের কণ্ঠস্বর। 

শুক্রবার সন্ধ্যায় যশোর-মাগুরা মহাসড়কের লেবুতলার তেঁতুলতলা বাজারে বাসের ধাক্কায় চালকসহ মারা যান সাতজন। ইজিবাইকে চালকসহ নয়জন যাত্রী ছিলেন। ভাগ্যক্রমে শিশু খাদিজা বেঁচে গেলেও মৃত্যুর মুখোমুখি তার মা সোনিয়া খাতুন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন তিনি। দুর্ঘটনায় অজ্ঞান অবস্থায় স্থানীয়রা খাদিজাকে উদ্ধার করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। বর্তমানে খাদিজার শারীরিক অবস্থার উন্নতির দিকে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। 

খাদিজার চাচা রনি হোসেন বলেন, ‘খাদিজার গলায় টিউমার ছিল। এটি অপারেশনের জন্য শুক্রবার বিকালে তারা বাড়ি থেকে ইজিবাইকে যশোরের একটি ক্লিনিকে যাচ্ছিলেন। পথে লেবুতলা এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা বেপরোয়া একটি বাস তাদের চাপা দিয়ে কিছু দূর সামনে নিয়ে যায়। এতে আমাদের পরিবারের পাঁচজন মারা যান। এর মধ্যে বেঁচে যায় খাদিজা ও তার মা সোনিয়া। রাত ৯টার দিকে ওর জ্ঞান ফেরে। ফিরেই তার মাকে খোঁজ করে। তাকে বলেছি মা বাইরে আছে। তুমি সুস্থ হও তোমাকে বাড়িতে নিয়ে যাব। মাঝেমধ্যে ওর ভাইদের ডাকছে। তাকে মিথ্যা সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কেঁপে উঠছে হৃদয়।’

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘খাদিজার শারীরিক অবস্থা অনেকটা ভালো। এ অবস্থায় পরিবারের  মৃত্যুর খবরে তার অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই কাউকে বলতে নিষেধ করেছি।’ 

খাদিজা বাঘারপাড়া উপজেলার যাদবপুর গ্রামের হেলাল মুন্সীর মেয়ে। হেলাল ঢাকার হেমায়েতপুরে একটি চামড়া প্রক্রিয়াজাত কারখানায় কর্মরত। ঘটনার সংবাদ শুনে রাতে রওনা দিয়ে ভোরে বাড়ি এসে পৌঁছেছেন। তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন। কোরবানির ঈদের আগে সবাই গ্রামে এসেছিলেন। ছুটি শেষে হেলাল কর্মস্থলে ফিরে গেলেও স্ত্রী সোনিয়া বেগম যমজ সন্তান হাসান-হোসেন ও মেয়ে খাদিজাকে (৫) নিয়ে বাড়িতে ছিলেন। জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান বলেন, ‘নিহতদের দাফন ও আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা হবে।’