বিশ্বমানের স্পিন বোলিং অ্যাটাক নিয়ে এ মুহূর্তে বিশ্বের যেকোনো দলের সমীহ আদায় করে নেয় আফগানিস্তান। বাংলাদেশকেও এখন ছেড়ে কথা বলে না আফগানরা। চলতি বছর ওয়ানডেতে ২-২-এ সমতাও লড়াইয়ের কথা বলে। কিন্তু বিশ্বকাপ মঞ্চে বাংলাদেশের কাছে পাত্তাই পেল না রশিদ খান-মোহাম্মদ নবিদের দল। গতকাল হিমাচলের ধর্মশালায় একপেশে ম্যাচে তাদের ৬ উইকেটে হারিয়েছে সাকিব আল হাসানের দল। দুর্দান্ত বোলিং আক্রমণে আফগানদের ১৫৬ রানে গুটিয়ে দেয়ার পর ৬ উইকেট হাতে রেখে জয় তুলে নেয় টাইগাররা।
গতকাল ৯২ বল বাকি থাকতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে এটিই সবচেয়ে বেশি বল বাকি রেখে জয়ের রেকর্ড বাংলাদেশের। আগের রেকর্ড ছিল ৫২ বলের, ২০১১ সালে চট্টগ্রামে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে।
বিশ্বকাপে এ নিয়ে তিনবারের মুখোমুখিতে প্রতিবারই জিতল বাংলাদেশ। আর সব মিলিয়ে ওয়ানডেতে ১৬ বারের মোকাবেলায় বাংলাদেশ জিতল ১০টিতে।
টানা তিন বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ জিতল বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে আফগানিস্তানকে ১০৫ রানে হারিয়ে শুভসূচনা পায় মাশরাফি বিন মর্তুজার বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২১ রানে হারিয়ে দেয় টাইগাররা। এবার ভারতে চলমান আসরে আফগানদের বল-ব্যাটে হারাল সাকিব আল হাসানের দল।
তামিম ইকবালের বিশ্বকাপ দলে না থাকাকে ঘিরে সম্প্রতি সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক টাইগারদের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ভয় ছিল। যদিও প্রথম ম্যাচে দারুণ আত্মবিশ্বাসী ছিল সাকিবের দল। এদিন দলগত নৈপুণ্যে জিতেছে বাংলাদেশ। মেহেদী হাসান মিরাজ, সাকিব, নাজমুল হোসেন শান্ত দলের জয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। অলরাউন্ড নৈপুণ্য দেখিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন মিরাজ। বল হাতে ২৫ রানে তিন উইকেট নেয়ার পর ব্যাট হাতে ৭৩ বলে ৫৭ রান করেন তিনি।
টার্গেট ছোট হলেও ২৭ রানের মধ্যে তানজিদ হাসান ও লিটন দাসের উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ। এরপর মিরাজ ও শান্তর আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে ভর করে উল্টো প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে কর্তৃত্বের আসনে বসে বাংলাদেশ। দুজন ১২৯ বলে ৯৭ রান যোগ করলে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় আফগানরা। দলীয় ১২৪ রানের সময় নভীন-উল-হকের বলে মিরাজ আউট হওয়ার পর সাকিব (১৪) ও মুশফিকুর রহিমকে (২*) নিয়ে দলকে জয়ের বন্দরে নোঙর করান শান্ত। বামহাতি এ ব্যাটার তিন বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় ৮৩ বলে ৫৯ রান করে অপরাজিত থাকেন।
জয়ের ভিতটা গড়ে দেন বোলাররাই। সাকিব ও মিরাজের ঘূর্ণিতে বেসামাল হয়ে পড়ে আফগানরা। দুজন শিকার করেন ছয় উইকেট। শুরুতে না হলেও পরে ভালো অবদান রেখেছেন পেস বোলাররা। ডেঞ্জারম্যান মোহাম্মদ নবিকে বোল্ড করেছেন তাসকিন আহমেদ। অভিজ্ঞ মুস্তাফিজুর রহমান ৭ ওভারে ২৮ রানের খরচায় তুলে নেন বিপজ্জনক হয়ে ওঠা রহমানুল্লাহ গুরবাজকে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দল থেকে উঠে আসা পেসম্যান শরিফুল ইসলাম দুই উইকেট শিকার করেন।
আফগানিস্তানের দুই উদ্বোধনী ব্যাটার দেখেশুনে শুরু করেন। তাই অষ্টম ওভারেও উইকেট সাফল্য পায়নি বাংলাদেশ। অবশেষে নবম ওভারে ডেডলক ভাঙেন সাকিব। তার বলে ডিপ স্কয়ার লেগে তানজিদ হাসানকে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন ইব্রাহিম জাদরান। এরপর গুরবাজকে নিয়ে ৩৬ রানের জুটি গড়া রহমত শাহকেও ফেরান সাকিব। রহমত সিলি মিড-অফে ক্যাচ দেন লিটন দাসকে। দ্বিতীয় স্পেলে এসে সাকিব আউট করেন নজিবুল্লাহ জাদরানকে। সব মিলিয়ে ৮ ওভারে ৩০ রান দিয়ে তিন উইকেট তুলে নেন সাকিব। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে উইকেট শিকারের তালিকায় ১২ নম্বরে উঠে যান সাকিব। রানেও তিনি অষ্টম স্থানে উঠেছেন কালই।
এরপর মিরাজ, মুস্তাফিজ, শরিফুল, তাসকিনরা আফগান ব্যাটিং লাইনআপ লণ্ডভণ্ড করে দেন। দলীয় ১১২ রানে দলনায়ক হাশমতউল্লাহ শহিদিকে সাজঘরের পথ দেখান মিরাজ। পরের ওভারে মুস্তাফিজের বলে তানজিদকে ক্যাচ দেন এক প্রান্ত আগলে রাখা গুরবাজ। ৬২ বলে ৪৭ রান করেন তিনি। টাইগারদের চতুর্মুখী আক্রমণে এরপর ৪৪ রানের মধ্যে বাকি ৬ উইকেট হারায় আফগানিস্তান।
বিশ্বকাপে শুভসূচনায় আনন্দিত ম্যাচসেরা খেলোয়াড় মিরাজের অনুভূতি ঝরে পড়ে এভাবে, ‘আমাদের জন্য দারুণ এক মুহূর্ত। আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি। বোলিংয়ে শুরুর দিকে কিছুটা সতর্ক ছিলাম। অধিনায়ক আমাকে বললেন সঠিক লাইন-লেংথে বল ফেলতে এবং আমি ধারাবাহিকভাবে সেটি করেছি। আমার আত্মবিশ্বাস এনে দেয়ায় অধিনায়ককে কৃতিত্ব দেব। ব্যাটিংয়ে আমার পরিকল্পনা ছিল বল বাই বল এগোনো। পিচে বল কিছুটা ঘুরছিল। চেষ্টা করেছি উইকেটে টিকে থাকতে। আমি সচরাচর ৮ নম্বরে ব্যাট করি। এখন টপ অর্ডারে ব্যাট করা দারুণ এক সুযোগ। আমি সবসময় ক্ষুধার্ত থাকি, কাজেই এটি আমার জন্য দারুণ এক মুহূর্ত।’
অধিনায়ক সাকিবের কণ্ঠে মিরাজ ও শান্তর প্রশংসা। তিনি বলেন, ‘মেহেদী ও শান্ত আমাদের ইনফর্ম খেলোয়াড়, তারা খুবই আত্মবিশ্বাসী। আমরা চাই তারা দলের জন্য ভালো পারফর্ম করুক।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের শুরুটা ভালো হয়নি। কিন্তু সবার বিশ্বাস, একবার আমরা একটি উইকেট পেলে পরে আরো পাই। এটা সহজ ছিল না, তবে বোলিং নিয়ে আমরা খুশি। গত কয়েকদিন আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমি আমার বোলিং দিয়ে দলের জয়ে অবদান রাখতে পেরে খুশি। পাঁচ বোলারকেই বলেছি যেন তারা সঠিক জায়গায় বল করে। স্পিনাররা আজ বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে এটা লম্বা এক টুর্নামেন্ট। আমি নিশ্চিত ফাস্ট বোলাররাও অবদান রাখবে।’
মঙ্গলবার সকালে ধর্মশালায় বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। ইংলিশরা প্রথম ম্যাচে ৯ উইকেটে হেরেছে নিউজিল্যান্ডের কাছে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
আফগানিস্তান: ৩৭.২ ওভারে ১৫৬/১০ (গুরবাজ ৪৭, জাদরান ২২, ওমরজাই ২২; মিরাজ ৩/২৫, সাকিব ৩/৩০, শরিফুল ২/৩৪)। বাংলাদেশ: ৩৪.৪ ওভারে ১৫৮/৪ (শান্ত ৫৯*, মিরাজ ৫৭, সাকিব ১৪; ওমরজাই ১/৯, ফারুকি ১/১৯, নভীন ১/৩১)। ফল: বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মেহেদী হাসান মিরাজ (বাংলাদেশ)।










