যশোর-কলকাতা রোড, দুই ধারে বিভিন্ন বয়সী উৎসুক মানুষ। শত শত মানুষের দলবেঁধে হাঁটা। কেউ তার বৃদ্ধ মা-বাবাকে কাঁধে তুলে হাঁটছেন। কেউ আবার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে অজানা ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছেন। দলবেঁধে এ যাত্রা ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে এ সড়কের শেষে ভারতের আশ্রয় শিবিরে। পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতা থেকে বাঁচতে নিরস্ত্র বাঙালিদের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যাওয়ার এ যাত্রা। এভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও যুদ্ধকালীন যশোর রোডে শরণার্থীদের অবর্ণনীয় দুর্দশা উঠে আসে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। ৫২ বছর আগের সে ইতিহাস গতকাল এভাবেই স্মরণ করে যশোরবাসী।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত যশোর রোডের পুলেরহাট বাজার থেকে কৃষ্ণবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত ‘স্মরণে সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড-৭১’ স্মৃতিচারণের আয়োজন করে জেলা প্রশাসন যশোর। প্রায় ২৫ মিনিটে এক কিলোমিটার এ যাত্রায় যুদ্ধকালীন যশোর রোডের শরণার্থীদের যুদ্ধবিভীষিকা, অবর্ণনীয় দুর্দশা ফুটে ওঠে।

প্রতীকী পদযাত্রার নির্দেশক কামরুল হাসান রিপন বলেন, ‘পাঁচ শতাধিক সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন শিক্ষার্থীরা সেপ্টেম্বর অন যশোর রোডের গৌরবোজ্জ্বল প্রতীকী স্মৃতিচারণে অংশ নেন। এ সড়কের শুরু থেকে শেষ স্থান কৃষ্ণবাটি গ্রাম পর্যন্ত তারা নিজ নিজ চরিত্রে ডুবে ছিলেন। সবাই যেন ফিরে গিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের সেই সেপ্টেম্বর মাসে।’

পদযাত্রা শেষে স্থানীয় কৃষ্ণবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টচার্য্য। তিনি বলেন, ‘ঐতিহাসিক যশোর রোড মুক্তিযুদ্ধের একটি অংশ। এ রোড ঘিরে আছে অনেক গল্প-গান। মুক্তিযুদ্ধে লাখো মানুষ জীবন বাঁচাতে এ পথ দিয়েই ভারতে আশ্রয় নেয়। অবর্ণনীয় দুর্দশা ও যুদ্ধচিত্র নিয়ে মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ রচনা করেছিলেন কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। এ কবিতাটি পড়লে বর্বর পাকিস্তানিদের নির্মম নৃশংস গণহত্যার চিত্র যেনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জেলা প্রশাসনের এ আয়োজনে নতুন প্রজন্ম তাদের ইতিহাসকে নতুনভাবে জানতে পারল। প্রতি বছরই এভাবে আমরা সেই ঐতিহাসিক রোডকে স্মরণ করতে চাই। একই সঙ্গে এ রোডকে সংরক্ষণে আমরা পদক্ষেপ নেব।’

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবরাউল হাছান মজুমদার বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যশোর রোডের নাম জড়িয়ে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনী যশোর রোড দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। আবার এ সড়ক দিয়ে নানা মানুষ ভারতে শরণার্থী হয়ে ছুটতে থাকে। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাতে ও সড়কটিকে স্মরণ করতে এ আয়োজন।’