নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেছেন, সমাজে নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, নারী ও কন্যাশিশুদের কল্যাণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে ১৮ কোটি মানুষের দেশে সরকারের একার পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব নয়। তাই যৌথ উদ্যোগে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আজ রোববার (১৫ মার্চ) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, নারী ও কন্যাশিশুদের কল্যাণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার কাজ করছে। তিনি জানান, শুধু স্নাতক নয়, স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের কীভাবে বিনা খরচে পড়াশোনার সুযোগ দেয়া যায়, কীভাবে তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায় এবং কীভাবে নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা যায়, এসব বিষয় সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, একজন নাগরিকের যেসব অধিকার থাকা উচিত, নারীদেরও একই অধিকার থাকা প্রয়োজন। সব মানুষের অধিকার, স্বকীয়তা, সম্মান ও মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখালে সমাজে কোনো বৈষম্য থাকবে না এবং তখন নারীর অধিকার নিয়ে আলাদা করে কথা বলার প্রয়োজনও হবে না।

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চিকিৎসক ও সমাজকর্মী ডা. জুবাইদা রহমান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার ও মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান, দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রশান্ত ত্রিপুরা, অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু এবং বাংলাদেশ ওয়াইডাব্লিউসিএর জাতীয় সম্পাদক হেলেন মনীষা সরকার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার। স্বাগত বক্তব্য দেন ফোরামের সহসভাপতি শাহীন আক্তার ডলি। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন গুল ই জান্নাত জেনি ও আমিনুল ইসলাম সুজন।

অনুষ্ঠানে দুইজন নারীকে সম্মাননা দেয়া হয়। তারা হলেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সুরভীর প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজকর্মী সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু এবং সাবেক নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান, নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা ও গণস্বাস্থ্য ট্রাস্টের চেয়ারম্যান শিরিন পারভীন হক।

সম্মাননা পাওয়ার পর সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, দেশের অনেক কন্যা ও শিশু এখনো অবহেলার শিকার। গ্রামের অনেক মেয়ে এখনো শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান, যেন সবাই একসঙ্গে নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় কাজ করে। তিনি বলেন, গ্রামে এখনো অনেক শিশু নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়। দীর্ঘ ৪৭ বছর ধরে তিনি অবহেলিত শিশু-কিশোরীদের শিক্ষার মাধ্যমে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করছেন এবং সুরভি সেই বিশ্বাসের প্রতীক।

নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা শিরিন পারভীন হক বলেন, তিনি নিজের সব যোগ্যতা নারীর অধিকারের পক্ষে কাজ করার জন্য উৎসর্গ করেছেন। নারীপক্ষের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল তার মায়ের বাড়ি থেকে। তাই অনুষ্ঠানে তিনি তার প্রয়াত মায়ের অবদানের কথা স্মরণ করেন।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নারীর প্রতি নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে সমাজে চলে আসছে। বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে এ মানসিকতা গভীরভাবে রয়েছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি জাতীয় নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারীকে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল কাছাকাছি পরিমাণ মনোনয়ন দিলেও অনেক দল সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। তার মতে, এতে পুরুষতন্ত্রের প্রভাবই স্পষ্ট হয়েছে এবং নারীর অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, যে জাতির নারীরা এগিয়ে যায় সেই জাতি সামগ্রিকভাবে এগিয়ে যায়। তিনি সম্মাননা পাওয়া ব্যক্তিদের নারীদের জন্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে কৃতজ্ঞতা জানান।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কন্যাশিশুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছে। সে লক্ষ্য সামনে রেখে নারীদের স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা খরচে শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগের পরিকল্পনা রয়েছে। তার মতে, শিক্ষাই একটি কন্যাশিশুকে অন্ধকার জীবন থেকে আলোকিত জীবনে নিয়ে যেতে পারে এবং বাল্যবিবাহ থেকেও রক্ষা করতে পারে।

এ সময় তিনি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে অবদানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

মানবাধিকারকর্মী ও লেখক ইলিরা দেওয়ান বলেন, যাদের সম্মাননা দেয়া হয়েছে তারা অনেক বাধা পেরিয়ে এ অবস্থানে পৌঁছেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকার নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে এবং ভবিষ্যতে সব শিশু নিরাপদ পরিবেশে বড় হতে পারবে।