সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে বিলুপ্ত প্রজাতির কচ্ছপ বাটাগুর বাসকার ৩৩টি বাচ্চা ফুটেছে। শনিবার সকালে ডিম ফুটে বাচ্চাগুলো বের হয়। এর আগে গত ৬ মার্চ সকালে করমজলের কচ্ছপ লালন-পালন কেন্দ্রের পুকুর পাড়ে একটি কচ্ছপ ৩৪টি ডিম দেয়। পরে সেগুলো সংগ্রহ করে স্যান্ডবিচে (বালুর চর) রাখা হয়। ৩৪টি ডিমের মধ্য থেকে এবার ৩৩টি বাচ্চা ফুটল। স্যান্ডবিচ থেকে তুলে বাচ্চাগুলোকে কচ্ছপ লালন-পালন কেন্দ্রের সংরক্ষণ প্যানে (ছোট পুকুর) রাখা হয়েছে।
এ নিয়ে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে কয়েক দফায় এ প্রজাতির কচ্ছপের বাচ্চা ফুটল। বর্তমানে এ কেন্দ্রে বিভিন্ন বয়সী মোট ৩৮৭টি কচ্ছপ রয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আজাদ কবির বলেন, করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের পুকুর পাড়ের স্যান্ডবিচে একটি বাটাগুর বাসকা প্রজাতির কচ্ছপ গত ৬ মার্চ ৩৪টি ডিম দেয়। এরপর ৭ মে ভোর থেকে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে শুরু করে। ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত একে একে ৩৩টি বাচ্চা ফুটে বের হয়। একটি ডিম নষ্ট হয়ে যায়। সকাল ৯টার পর স্যান্ডবিচ থেকে বাচ্চাগুলোকে তুলে ওই কেন্দ্রের প্যানে রাখা হয়েছে। প্যানে রেখে লালন-পালনের পর ছেড়ে দেয়া হবে কেন্দ্রের বড় পুকুরে।
আজাদ কবির বলেন, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির এ কচ্ছপ আমরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে লালন-পালন করে আসছি। বংশবৃদ্ধির জন্য আমরা সার্বক্ষণিক নজরে রাখছি। এর আগেও আমাদের এখানে বাটাগুর বাসকা কচ্ছপ ডিম দিয়েছে। সেই ডিম থেকে বাচ্চাও ফুটেছে।
উল্লেখ্য, ২০০০ সালের দিকে বন্যপ্রাণী গবেষকরা ধারণা করেন, পৃথিবীতে আর বাটাগুর বাসকার কোনো অস্তিত্ব নেই। পরে ২০০৮ সালে গবেষকরা প্রকৃতিতে বাটাগুর বাসকা আছে কিনা তা খুঁজতে শুরু করেন। খুঁজতে খুঁজতে নোয়াখালী ও বরিশালের বিভিন্ন জলাশয়ে আটটি বাটাগুর বাসকা পাওয়া যায়। যার মধ্যে চারটি পুরুষ ও চারটি স্ত্রী প্রজাতির। প্রজননের জন্য কচ্ছপগুলোকে গাজীপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিবিড়ভাবে লালন-পালন ও প্রজননের চেষ্টা করে বাটাগুর বাসকা প্রজাতির কচ্ছপগুলোকে। তার পরও তেমন সাফল্য পাওয়া যায়নি। তবে কয়েক বছরে গাজীপুরে প্রায় ৯৪টি বাচ্চা দিয়েছিল আটটি মা কচ্ছপ। সেখানে ভালো সাড়া পাওয়ায় ২০১৪ সালে মূল আটটি বাটাগুর বাসকা ও তাদের জন্ম দেয়া ৯৪টি ছানাসহ করমজল কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালে দুটি কচ্ছপের ৬৩টি ডিম থেকে ৫৭টি বাচ্চা হয়। ২০১৮ সালে দুটি কচ্ছপের ৪৬টি ডিম থেকে ২১টি বাচ্চা পাওয়া যায়। ২০১৯ সালে একটি কচ্ছপের ৩২টি ডিম থেকে ৩২টি বাচ্চা পাওয়া যায়। ২০২০ সালে ১০ মে একটি কচ্ছপের ৩৫টি ডিম থেকে ৩৪টি বাচ্চা পাওয়া যায়। এসব বাচ্চা থেকে ২০১৭ সালে দুটি, ২০১৮ সালে পাঁচ, ২০১৯ সালে পাঁচটি কচ্ছপ সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীতে অবমুক্ত করে বন বিভাগ। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ১০টি কচ্ছপ সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে।
পৃথিবীতে প্রায় ৩০০ প্রজাতির কচ্ছপ রয়েছে। একসময় এ অঞ্চলে প্রায় ২৬ প্রজাতির কচ্ছপ দেখা যেত। মাঝখানে একদমই দেখা মিলছিল না বাটাগুর বাসকার। এমন পরিস্থিতিতে বাটাগুর বাসকা নিয়ে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ বন বিভাগ। পরবর্তী সময়ে তাদের সঙ্গে আরো যোগ দেয় প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, অস্ট্রিয়ার জু ভিয়েনার গবেষক দল এবং যুক্তরাষ্ট্রের টার্টল সারভাইভাল অ্যালায়েন্স।










