দালালের মাধ্যমে সাগর পথে ইউরোপে যেতে গিয়ে লিবিয়ায় নিখোঁজ ২৪ তরুণের জন্য স্বস্তিতে নেই তাদের পরিবার। নিখোঁজ অনেকের সর্বশেষ পরিণতিও জানা নেই স্বজনের। চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের। কেউ কেউ মাফিয়ার মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের শারীরিক অবস্থাও ভালো নেই। কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা লিবিয়ার কারাগারে বন্দি। এ পরিস্থিতিতে সরকারের হস্তক্ষেপ চায় এদের পরিবার।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেটের প্রবাসীঅধ্যুষিত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে লিবিয়া থেকে ইতালি পাঠানোর জন্য তরুণদের উদ্বুদ্ধ করে দালাল চক্র। এসব তরুণ একপর্যায়ে পরিবারের অভিভাবককে রাজি করিয়ে দালালচক্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। এরপর চলে যান লিবিয়ায়। দালালের সঙ্গে চুক্তি হয় গন্তব্যে পৌঁছার আগে কোথাও পুলিশের হাতে কেউ আটক হলে দালাল তার নিজ দায়িত্বে ও খরচে তাকে মুক্ত করবে। কিন্তু লিবিয়ায় যাওয়ার পর দালালরা চুক্তির কোনো কিছুই মানছে না। তারা নানা অজুহাতে তরুণদের বন্দি করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিতে থাকে। এমন প্রতারণার শিকার সিলেটের ২৪ পরিবারের সন্ধান পাওয়া গেছে।
লিবিয়ায় নিখোঁজ বিয়ানীবাজারের পূর্ব লাউজারী গ্রামের তানহারুল ইসলামের বাবা আমিরুল ইসলাম জানান, চার-পাঁচ মাস আগে তার ছেলে লিবিয়ায় যায়। সেখানে যাওয়ার পরপরই মাফিয়াদের খপ্পরে পড়ে। দালালরা যেভাবে চুক্তি করেছিল, তারা সেভাবে কাজ করেনি। উল্টো জিম্মি করে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আমিরুল ইসলাম জানান, তার ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর খুঁজতে গিয়ে আরো অনেকের সন্ধান তিনি পেয়েছেন। এর মধ্যে তারা ২৪ তরুণের পরিবার একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে সন্তানদের উদ্ধারের চেষ্টা করছে।
নিখোঁজ তরুণদের মধ্যে রয়েছেন বিয়ানীবাজার উপজেলার পূর্ব লাউজারী গ্রামের আব্দুল্লাহ আল মামুন, হোসেন আহমদ, আব্দুল্লাহ আল জুনেদ, আরিফ আহমদ দুলাল, খশিরবন্দ (হাতিটিলা) গ্রামের রাজু আহমদ, একই গ্রামের এনামুল হক, খশির কোনাপাড়া গ্রামের কামরুজ্জামান রাহাত, ঘুঙ্গাদিয়া নয়াগাঁও গ্রামের আবদুল আজিজ, একই গ্রামের আহমদ অজিত, গড়রবন্দ গ্রামের আব্দুল করিম, বিশ্বনাথ উপজেলার পদুনাপুরের মওরশ আলী, হবিগঞ্জের বায়েজিদ আহমদ, জকিগঞ্জ উপজেলার আবুল কাশেম আজহারসহ ২৪ তরুণ। তারা বর্তমানে পরিবার থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
ছেলে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে পূর্ব লাউজারী গ্রামের শাহিনা বেগম পুত্রের জন্য কান্নায় বুক ভাসাচ্ছেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, পাঁচ মাস আগে তার পুত্র সায়েল লিবিয়ায় যায়। সর্বশেষ ৩ মাস আগে তার সঙ্গে কথা হয়। এরপর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তিনি জানান, লিবিয়ায় অবস্থানরত অন্য এক তরুণের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন তার পুত্র কারাগারে। তিনি পুত্রকে দেশে আনতে সরকারের সহযোগিতা চান।
নিখোঁজ তানহারুল ইসলামের বাবা আমিরুল ইসলাম আরো জানান, নিখোঁজ ২৪ জনের মধ্যে কেউ কেউ কারাগারে রয়েছেন বলে জানতে পেরেছেন। লিবিয়ার খামছাখামছিন কারাগারে বন্দি থাকা এসব তরুণ শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। সিলেটের কানাইঘাটের এক তরুণ কারাগার থেকে অসুস্থ হয়ে একটি হাসপাতালে এলে তার মাধ্যমে পাঁচ-ছয় তরুণের কারাগারে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। তার ছেলের ব্যাপারটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। তিনি জানান, তিন মাস আগে দালালরা তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দিয়েছিল। ওখানকার দালাল চক্র পাঁচ তরুণের পরিবারের কাছ থেকে উদ্ধারের কথা বলে প্রায় ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এরপর তিন মাস কেটে গেছে তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ নেই।
অপরদিকে বিয়ানীবাজারের আমিনুর রহমান নামের অপর এক যুবক মাফিয়ার গুলিতে নিহত হয়েছে বলে জানতে পেরেছে তার পরিবার। বাবা আলাউদ্দিন জানান, অন্যদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি আমার ছেলে মারা গেছে। আমরা এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না।
নিখোঁজ তরুণ আব্দুল্লাহ আল মামুনের বাবা আতিকুর রহমান বলেন, তার ছেলে খুব শান্ত স্বভাবের। ইউরোপের দেশ ইতালি যেতে বায়না ধরে। প্রথমে রাজি হননি, একপর্যায়ে চাপাচাপিতে রাজি হন। সে লিবিয়ায় যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ। বেঁচে আছে না নেই এ খবরটাও পাচ্ছেন না তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু এ ২৪ তরুণই নয়, সিলেটজুড়ে এ রকম আরো তরুণ রয়েছে, যারা লিবিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ। আবার কেউ কেউ সাগরে ডুবে প্রাণও হারাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে যারা কারাগারে বন্দি, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চায় পরিবার।
সিলেট জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (প্রবাসীকল্যাণ শাখা) মাসুমা আক্তার কণা নিখোঁজের বিষয়ে তার বিস্তারিত জানা নেই বলে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, এ অঞ্চলের প্রবাসীদের সমস্যার নানা সমাধানসহ মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন তত্পর রয়েছে।










