ত্রিনিদাদে ২০০৭ সালের বিশ্বকাপ ম্যাচে ভারতকে ৫ উইকেটে হারিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশ। মাশরাফি বিন মর্তুজার বীরত্বপূর্ণ বোলিংয়ের পর তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানের ফিফটিতে সেদিন বাজিমাত করে টাইগাররা। তামিম ইকবালের মতোই পুনেতে গতকাল ঠিক ৫১ রান করলেন জুনিয়র তামিম (তানজিদ হাসান তামিম)। মুশফিক ফিফটি না পেলেও করলেন ৩৮, আর ৬৬ রান করলেন লিটন দাস। তবে বোলিংয়ে কারো মাশরাফি হয়ে ওঠা হলো না। তাই পুনেতে ফিরল না ত্রিনিদাদের স্মৃতি। গতকাল বিশ্বকাপ ম্যাচে ২৫৬ রানের পুঁজি নিয়ে বাংলাদেশ হারল ৭ উইকেটে।

ব্যাটিং শক্তিধর ভারতের বিপক্ষে মাঝারি মানের পুঁজি নিয়ে জেতা হলো না বাংলাদেশের। ব্যাটিং গ্রেট বিরাট কোহলির হার না মানা সেঞ্চুরিতে ভর করে ৫১ বল বাকি থাকতেই জয় তুলে নেয় ভারত। চলতি আসরে টানা চার জয়ে সেমিফাইনালের সম্ভাবনা উজ্জ্বল করল স্বাগতিকরা। আর চার ম্যাচের তিনটিতেই হেরে শেষ চারের সম্ভাবনা ধূসর হলো বাংলাদেশের। পরের পাঁচ ম্যাচের সবগুলোয় জিতলে তবেই আশা থাকবে সাকিব-লিটনদের। আগামী মঙ্গলবার মুম্বাইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। তার আগে রোববার ধর্মশালায় মুখোমুখি হবে টেবিলের এক ও দুই নম্বর দল নিউজিল্যান্ড ও ভারত।

৯৭ বলে ৬টি চার ও ৪টি ছক্কায় ১০৩ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জেতান কোহলি। স্পিনার নাসুম আহমেদের বলকে ডিপ মিড উইকেট অঞ্চল দিয়ে ছক্কা মেরে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। সেই সঙ্গে নিশ্চিত হয় দলের জয়ও। তার সঙ্গে ৩৪ রানে অপরাজিত থাকেন লোকেশ রাহুল। এর আগে রোহিত শর্মা ৪০ বলে ৪৮ ও শুভমান গিল ৫৫ বলে ৫৩ রান করে ভারতের জয়ের ভিত গড়ে দিয়ে যান। সেই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে দলকে জেতান কোহলি। এ পথে তুলে নেন নিজের ৪৮তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। 

ওয়ানডে সেঞ্চুরিতে আগে থেকেই দুইয়ে ছিলেন কোহলি। এবার ৪৯ সেঞ্চুরি নিয়ে এক নম্বরে থাকা শচীন টেন্ডুলকারের আরো কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন তিনি। ৪৬৩ ম্যাচে ৪৯ সেঞ্চুরি নিয়ে রেকর্ডের অধিকারী টেন্ডুলকার, তিনি টেস্টেও সর্বোচ্চ ৫১ সেঞ্চুরির মালিক। তবে ওয়ানডেতে কোহলির কাছে মসনদ হারাচ্ছেন নিশ্চিতই। তার প্রায় অর্ধেক (২৮৫) ম্যাচ খেলেই ৪৮টি সেঞ্চুরি পেয়েছেন কোহলি। হয়তো এ বিশ্বকাপেই কোহলি ছুঁয়ে ফেলবেন কিংবদন্তি টেন্ডুলকারকে। ৩১টি সেঞ্চুরি নিয়ে তিনে রোহিত শর্মা। অর্থাৎ, ওয়ানডে ক্রিকেটে সেঞ্চুরিতে শীর্ষ তিনজনই ভারতের! 

নিউজিল্যান্ড ম্যাচে পায়ের মাংসপেশিতে চোট পাওয়া সাকিব কাল ভারতের বিপক্ষে খেলেননি। ফলে শুরুতেই ধাক্কা। টস জিতে আগে ব্যাটিং বেছে নেন ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ওপেনিংয়ে ১৫ ওভারের মধ্যেই ৯৩ রান যোগ করে বাংলাদেশকে দুর্দান্ত সূচনা এনে দেন তানজিদ হাসান ও লিটন দাস। এর মধ্য দিয়ে ২৪ বছর পুরোনো রেকর্ড ভাঙলেন তারা দুজন। ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উদ্বোধনী জুটি এখন এটিই। তামিম ৫ বাউন্ডারি ও ৩ ছক্কায় ৪৩ বলে ৫১ রান করে স্পিনার কুলদীপ যাদবের শিকার হন। 

এরপর কিছুক্ষণ ঝড় বয়ে যায়। রবীন্দ্র্র জাদেজার ঘূর্ণি ও মোহাম্মদ সিরাজের গতিতে ৯৩/০ থেকে দেখতে না দেখতেই বাংলাদেশের স্কোর হয়ে যায় ১৩৭/৪! শান্ত ১৭ বলে ৮, মেহেদী হাসান মিরাজ ১৩ বলে ৩  ও লিটন ৮২ বলে ৬৬ রান করে সাজঘরের পথ ধরেন। 

এরপর মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ টানেন দলকে। তাওহিদ হৃদয়কে নিয়ে পঞ্চম উইকেটে ৪২ রান যোগ করেন মুশফিক। তাওহিদ ৩৫ বলে ১৬ রান করে শার্দূল ঠাকুরের শিকার হন। দুর্দান্ত খেলতে থাকা মুশফিক ৪৬ বলে ৩৮ রান করে জসপ্রীত বুমরাহর বলে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ক্যাচ দেন জাদেজাকে। আউট হওয়ার আগে মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে ৩১ বলে ২২ রান যোগ করেন তিনি। এরপর নাসুম ও অন্যদের নিয়ে দলের সংগ্রহটা আড়াইশ পার করেন অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহ। বুমরাহর বলে বোল্ড হওয়ার আগে ৩ চার ও ৩ ছক্কায় ৪৬ রান করেন তিনি। 

এদিন সাকিবের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় ব‍্যাটসম‍্যান হিসেবে বিশ্বকাপে হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন মুশফিক। ৩৩ ইনিংসে তার রান এখন ১ হাজার ৩৪। সাকিব ৩২ ম্যাচে করেছেন ১ হাজার ২০১ রান। 

হারশেষে নাজমুল শান্ত বলেন, ‘ভারত সব সময়ই ভালো দল। তারা এভাবে খেলতে অভ্যস্ত এবং আজ দেখিয়ে দিল, আমাদের চেয়ে ভালো ক্রিকেট খেলার সামর্থ্য রাখে। আমরা নিজেদের সেরাটা দিতে পারিনি। ব্যাটিংয়ের শেষটা ভালো হয়নি। তানজিদ ও লিটন যদি আরো কিছুক্ষণ ব্যাট করত, তাহলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত। আশা করি, পরের ম্যাচে আমাদের ব্যাটাররা আরো দায়িত্ব নিয়ে খেলবে।’

সাকিবের চোট নিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি দ্রুতই সেরে উঠছেন। আমি আশাবাদী, তিনি পরের ম্যাচেই খেলবেন।’

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৫৬/৮ (লিটন ৬৬, তানজিদ ৫১, মাহমুদউল্লাহ ৪৬, মুশফিক ৩৮; জাদেজা ২/৩৮, বুমরাহ ২/৪১, সিরাজ ২/৬০)। ভারত: ৪১.৩ ওভারে ২৬১/৩ (কোহলি ১০৩*, গিল ৫৩, রোহিত ৪৮, লোকেশ ৩৪*; মিরাজ ২/৪৭, হাসান ১/৬৫)। ফল: ভারত ৭ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: বিরাট কোহলি (ভারত)।