দেশের উপকূলীয় বঙ্গোপসাগর ও পদ্মা-মেঘনাসহ বিভিন্ন নদীতে টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ আহরণে নেমেছেন জেলেরা। মা-ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে তিন সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ শেষ হলেও জালে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত মাছ। পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূল এবং চাঁদপুর, পিরোজপুর, বরগুনা ও বরিশালের নদীগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলে অনেকটা খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে জেলেদের। ফলে জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে দুশ্চিন্তা দেখা গেছে।
সারা দেশে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল সরকার। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই কুয়াকাটাসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে ছোট-বড় ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে নামেন পটুয়াখালীর জেলেরা। তবে গতকাল তীরে ফিরে আসা ট্রলারগুলোতে ইলিশের পরিমাণ তুলনামূলক কম ছিল বলে জানা গেছে।
সরজমিনে ঘুরে জানা গেছে, সাগরের তীরে অগভীর এলাকায় ইলিশের আনাগোনা অনেক কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাননি জেলেরা। তবে প্রশাসনিক নজরদারি এড়িয়ে নিষেধাজ্ঞার শেষ সপ্তাহে চুরি করে গভীর সাগরে যাওয়া গুটিকয়েক ট্রলার কিছুটা বেশি পরিমাণ ইলিশ ও সামুদ্রিক মাছ নিয়ে কূলে ফিরেছে।
গতকাল সকাল থেকে পটুয়াখালীর মহিপুর ও আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ বিক্রিকে কেন্দ্র করে হাঁকডাকে ব্যস্ততা দেখা গেলেও বাজারে দাম ছিল চড়া। বর্তমানে নিলাম প্রক্রিয়ায় এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হয় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। এছাড়া ৭০০-৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা, ৫০০-৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং জাটকা ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় গতকাল।
উপকূলবর্তী এলাকায় মাছের আকাল নিয়ে কুয়াকাটার স্থানীয় জেলে আব্দুর রহিম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে এ সৈকতের কাছেই খুঁটা জাল ফেললে বড় বড় ইলিশ মিলত। এখন আর উপকূলের কাছাকাছি কোনো ইলিশ পাওয়া যায় না।’
অন্যদিকে আলীপুর ঘাটের ট্রলার মালিক মো. গফুর মিয়া জানান, গত দুই বছর ধরে সাগরে আশানুরূপ মাছ মিলছে না। তার ওপর ঘন ঘন বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব রয়েছে।
কম মাছ পাওয়ার পেছনে অবৈধভাবে মৎস্য শিকার ও ট্রলারের দাপটকে দায়ী করেছেন মহিপুরের ‘গাজী ফিশ’-এর স্বত্বাধিকারী মো. মজনু গাজী। তিনি বলেন, ‘সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে সাগরে মাছের বংশবৃদ্ধি ঘটলেও অবৈধ ট্রলিং বোটগুলো মাছ ধরার চেয়ে নষ্ট করে বেশি। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর ও নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।’
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী জানান, বিগত বছরগুলোর তুলনায় বর্তমানে সাগরে মাছ ধরার ট্রলারের সংখ্যা বহু গুণ বেড়েছে। ফলে উপকূলের কাছাকাছি এলাকাগুলোতে মাছ আগের মতো পাওয়া যায় না। তবে গভীর সমুদ্রে যাওয়া ট্রলারগুলোতে অনেক ইলিশ ধরা পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পটুয়াখালীর মতো চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীতেও মাছ শিকারে নেমেছেন জেলেরা। দীর্ঘ বিরতির পর আশা নিয়ে নদীতে নামলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা পাচ্ছেন না তারা।
চাঁদপুরের জেলেরা জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে জাল ফেলেও প্রত্যাশিত মাছ মিলছে না। এমনকি অনেকের নৌকার জ্বালানি খরচও উঠছে না। এতে পরিবার-পরিজনসহ জীবিকা নির্বাহ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। তবে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের আশায় এখনো নদীর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন হাজারো জেলে।
চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। এর চেয়ে বড় দেড় কেজি পর্যন্ত ওজনের ইলিশের দাম হাঁকা হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়।
স্থানীয় আড়তদাররা আশা করছেন, গভীর সমুদ্রে থাকা সব ট্রলার কূলে ফিরলে বাজারে ইলিশের জোগান বাড়বে। দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক জানান, এবারের প্রজনন মৌসুমে প্রায় ৯০ শতাংশ মা-ইলিশ ডিম ছেড়েছে। এখন জাটকা সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন আরো বাড়বে।
এদিকে নিষেধাজ্ঞা শেষে মেঘনা নদীতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পেয়ে হতাশ বরিশালের জেলেরা। এছাড়া ঘাটে মাছের সরবরাহ শুরু হলেও কমেনি ইলিশের দাম। বিশেষ করে বড় আকারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২৯ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ইলিশ শিকারে নামেন বরিশালের মেঘনা, কালাবদর, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, জয়ন্তী, আড়িয়ল খাঁ ও কীর্তনখোলাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর জেলেরা। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই জাল, নৌকা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে নদীতে ছুটে যান তারা। গতকাল ভোর থেকে মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে শুরু করেন জেলেরা। মেঘনার হিজলা উপজেলার হরিণাথপুর ও নগরীর পোর্ট রোডের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে বাড়তে থাকে মাছবাহী নৌকার আনাগোনা। তবে নৌকায় প্রত্যাশিত মাছ ছিল না বলে জানা গেছে।
দুপুর ১২টার দিকে পোর্ট রোডের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে জেলে আবুল হোসেন জানান, সাতজন মিলে মধ্যরাতে নদীতে মাছ ধরতে নেমেছিলেন। তাদের জালে ধরা পড়া ইলিশ ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। রাতে আবারো মাছ ধরতে নদীতে নামবেন।
ঘাটের আড়তদার জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘বাজারে ইলিশের চাহিদা বেশি থাকায় দাম কমেনি। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। আর ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি হালি ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়।’
একই হতাশা প্রকাশ করেছেন পিরোজপুর ও বরগুনার জেলেরা। তাদের ভাষ্য, নিষেধাজ্ঞার সময় তারা বিধিনিষেধ যথাযথ পালন করেছেন। সরকারি সহায়তায় পরিবার নিয়ে কোনোরকম দিন কাটালেও আশায় ছিলেন নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা পার করে নদীতে নেমে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পেয়ে আরো দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। কারণ নিষেধাজ্ঞার সময় সংসার চালাতে ধার-দেনা করতে হয়েছে তাদের। আশা ছিল, নদীতে ইলিশ ধরে সেসব পরিশোধ করবেন। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় তা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়াল।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রতিনিধিরা










