রাজশাহী নগরীতে এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রাণঘাতী করোনা পরীক্ষার সনদ প্রতারণা চলছিল। এ ঘটনায় যুক্ত খোদ সিভিল সার্জন দপ্তরের কর্মী। কিন্তু ঘুণাক্ষরেও বিষয়টি টেরই পাননি কর্তারা। অবশেষে নগর গোয়েন্দা পুলিশের জালে আটকা পড়েছেন তারেক আহসান ওরফে আপেল (৩৫) নামের সিভিল সার্জন দপ্তরের ওই কর্মী। তিনি কর্মরত ছিলেন অফিস সহায়ক পদে। আপেল নগরীর কাটাখালী থানার কাপাসিয়া এলাকার আহসান উল্লাহর ছেলে।
এ ঘটনায় গ্রেফতার হয়েছেন তার সহযোগী নগরীর বোয়ালিয়া থানার হেতেমখাঁ লিচু বাগান ওয়াবদা কলোনির আশরাফুল ইসলামের ছেলে রফিকুল ইসলাম (৪০) ও তার স্ত্রী সামসুন্নাহার শিখা (৩৫)। গ্রেফতার রফিকুল ইসলাম রাজশাহী বক্ষব্যাধি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক।
বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ি থেকে স্ত্রীসহ গ্রেফতার হন রফিকুল ইসলাম। আর গতকাল বেলা ১১টার দিকে নগরীর জাদুঘরের মোড়ে এলাকার বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের সামনে থেকে গ্রেফতার হন আপেল।
তারা বক্ষব্যাধি ক্লিনিক কেন্দ্রিক পিপিআই সেন্টারে করোনা পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে বিদেশগামীসহ অন্যদের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছিলেন। অভিযানে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১০০টি করোনা পরীক্ষার সনদের জাল কপি।
গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে অভিযানের বিস্তারিত সাংবাদিকদের জানান মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার উপপুলিশ কমিশনার মো. আরেফিন জুয়েল। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা পুলিশকে জানিয়েছেন, বিদেশগামীরা করোনা পরীক্ষায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী সদর হাসপাতাল ও বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এবং সিভিল সার্জন অফিসে নমুনা জমা দেন। তাদের অনেকেরই ৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে করোনা পরীক্ষার সনদের প্রয়োজন হয়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে করোনা পরীক্ষার নমুনা প্রদানের ফরম থেকে মোবাইল নম্বর ও নাম ঠিকানা সংগ্রহ করে চক্রটি। সেই সঙ্গে তারা অফিসের পিয়ন বা কম্পিউটার অপারেটরের মাধ্যমে করোনার নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টের কপি সংগ্রহ করতেন।
রিপোর্ট নেগেটিভ সত্ত্বেও চক্রের সদস্যরা বিদেশগামীদের ফোনের মাধ্যমে জানাতেন, করোনা রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। রিপোর্ট নেগেটিভ দেয়ার শর্তে অর্থ দাবি করতেন চক্রের সদস্যরা। সেক্ষেত্রে বিদেশগামীদের অবস্থা বুঝে ৩-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করতেন।
এ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি সিভিল সার্জন অফিস কেন্দ্রিক একটি চক্র করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে প্রতারণা করছে। তাদের প্রধান টার্গেট ছিল বিদেশগামীরা। এর বাইরেও যারা নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা করাতেন, তাদেরও একই কায়দায় জিম্মি করছিল চক্রটি।
তিনি আরো বলেন, এরই মধ্যে চক্রের হোতা ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য দুজন পলাতক। ওই চক্রের সদস্য রফিকুল ইসলাম সিভিল সার্জন দপ্তর থেকে তথ্য নিয়ে গিয়ে স্ত্রীকে দিতেন।
এরপর ওই নারী সে তালিকা ধরে লোকজনকে ফোন দিতেন। বিকাশ নম্বর দিয়ে চাহিদামতো রিপোর্ট দেয়ার শর্তে অর্থ আদায় করতেন। কিন্তু আদতেই তারা রিপোর্ট বদলাতেন না। মাঝখানে প্রতারণা করে অর্থ হানিয়ে নিতেন। ওই নারী এমন প্রতারণার মাধ্যমে ২ হাজার ২৫ জনের কাছে অর্থ আদায়ের কথা স্বীকার করেছেন। চক্রে সিভিল সার্জন দপ্তরের আর কেউ জড়িত থাকলে তাদের আমরা খুঁজে বের করব।
এদিকে নিজ দপ্তরে চার মাস ধরে এমন কাণ্ডে গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি নন রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. কাইয়ুম তালুকদার । তার ভাষ্য, ঘটনাটি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিযেছেন। যারা এ ঘটনায় জড়িত তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ আইনত ব্যবস্থা নেবে। পুলিশই খুঁজে বের করে এ চক্রে আর কারা জড়িত।










