অনুমোদনের সাড়ে নয় বছর পরও ২৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করতে পারেনি খুলনা সদর হাসপাতাল। বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র ১১০টি শয্যা। নতুন ভবন নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে বাড়তি রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে। অবকাঠামো তৈরির প্রকল্পও একাধিকবার আটকে যাওয়ার পর নতুন করে চলছে নির্মাণকাজ। চলমান প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জুনে।
জানা গেছে, ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগীর চাপ থাকে। ভর্তি থাকে ১৫০-১৭০ জন। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেককে ভর্তি করা সম্ভব হয় না।
সরজমিনে দেখা গেছে, একটি টিনশেড ভবনে পুরুষ বহির্বিভাগের সেবা চলছে। নারী বহির্বিভাগেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের। ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ভর্তি রোগীদের অনেককে বারান্দায় বিছানা পেতে থাকতে হচ্ছে। শিশুদের জন্য শয্যা রয়েছে মাত্র ছয়টি। একটি মাত্র অপারেশন থিয়েটারে চলছে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম। হাসপাতাল এলাকাজুড়ে দালাল ও ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদেরও আনাগোনা রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ১০০ শয্যার হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার অনুমোদন দেয়। এরপর সাড়ে নয় বছরে মাত্র ১০টি শয্যা বাড়িয়ে ১১০টি চালু করা হয়েছে। ২৫০ শয্যার জন্য জনবল, পদায়ন ও ওষুধ সরবরাহের অনুমোদন থাকলেও নতুন ভবন নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকায় পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
হাসপাতালে ১২টি আইসিইউ ও ১৮টি এইচডিইউ শয্যাও চালু নেই। ৩০ শয্যার এসব ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা, জনবল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি এখনো পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকসহ মোট ৮৬টি পদের মধ্যে ৪৮টিই শূন্য।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রফিকুল ইসলাম গাজী বলেন, ‘এসবের পাশাপাশি হাসপাতালকে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের “স্ট্যান্ডার্ড সেটআপ”-এর আওতায় আনার কাজ চলছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।’
কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, বর্তমানে হাসপাতালটিতে দুটি ভবন রয়েছে। একটি তিনতলা মূল ভবন, অন্যটি চারতলা। এসব ভবনে ১১০ শয্যার সেবা চালু রয়েছে। মূল ভবনের তৃতীয় তলায় পেয়িং ও কেবিনের একটি অংশ ২০২২ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পুরনো ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার দেয়াল ও ছাদের অবস্থাও নাজুক। ফলে মূল ভবনটি দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ কারণে পুরুষ বহির্বিভাগ তিনতলা মূল ভবনের বিপরীতে টিনশেডে এবং নারী বহির্বিভাগ চারতলা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের আগস্টে নতুন ১২ তলা ভবনের ভিত্তি দিয়ে ছয়তলা পর্যন্ত নির্মাণের জন্য একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। তবে কাজ শুরু হয় ২০২০ সালে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। ২০২৪ সালে প্রকল্পটি বাতিল হয়। এরপর প্রায় দেড় বছর প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। পরে চলতি বছর ছয়তলা ভবনের অসম্পন্ন কাজ শেষ ও ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের জন্য নতুন প্রকল্পের আওতায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। গত ৫ এপ্রিল ছয়তলা ভবনের অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে আজাদ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে ৮ কোটি ৯৯ লাখ টাকার চুক্তি করে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে সপ্তম ও অষ্টম তলা নির্মাণে মেসার্স লেলিন ট্রেডার্সের সঙ্গে ১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার চুক্তি হয়। জুনের শেষ দিকে নতুন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।
খুলনা গণপূর্ত অধিদপ্তর-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘ভবন নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক কাজের চলমান প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে প্রায় ২৪ কোটি টাকার কাজ হবে। এর আওতায় ভবনে আরো দুই তলা যুক্ত হবে। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের জুনে।’
হাসপাতালে রোগীদের খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, নিয়মিত খাবারে স্বাদহীন মাংস ও পানির মতো পাতলা ডাল দেয়া হয়। রান্নাঘরের পরিবেশ নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৬ বছর ধরে একই ঠিকাদার হাসপাতালটিতে খাবার সরবরাহ করছেন। মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে নতুন করে টেন্ডার দেয়া যাচ্ছে না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. রফিকুল ইসলাম গাজী বলেন, ‘কাজে গাফিলতি ও অনিয়মের কারণে হাসপাতালের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন আটকে ছিল। এখন কাজ চলছে। নতুন ভবনের কাজ শেষ হলে সেবা দেয়ার সুযোগ ও সক্ষমতা দুটিই বাড়বে। এতে আরো ১৫০টি শয্যা চালু করা সম্ভব হবে।’










