ওয়ানডে ক্রিকেটে ৪৯তম সেঞ্চুরিতে শচীন টেন্ডুলকারকে ছুঁয়ে ফেললেন বিরাট কোহলি। ৫০ ওভারের ফরম্যাটে যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির মালিক হয়ে ৩৫তম জন্মদিনও রাঙালেন তিনি। গতকাল কলকাতার ইডেন গার্ডেনস স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১১৯ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন কোহলি। তার মাইলফলক ছোঁয়ার কীর্তির দিন ভারতের বোলারদের ইন্দ্রজালে আটকা পড়ল হাই-স্কোরিং দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের পর ম্যাচে ব্যাটে ঝড় তুলে চলা প্রোটিয়ারা এবার মাত্র ৮৩ রানেই শেষ! ব্যাট-বলে কর্তৃত্ব করে পাওয়া ২৪৩ রানের বিশাল জয়ে টেবিলের শীর্ষস্থানও নিশ্চিত করে ফেলল হট ফেভারিট ভারত। 

মুম্বাইতে আগের ম্যাচেই শ্রীলংকাকে ৫৫ রানে অলআউট করে ৩০২ রানের বিশাল জয় পায় ভারত। স্বাগতিকদের অবিশ্বাস্য বোলিং ব্রিগেড ইডেনেও জ্বলল। প্রোটিয়াদের তারকাখচিত ব্যাটিং লাইনআপকে রীতিমতো মাটিতে মিশিয়ে দিল তারা। ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়া দলটির আয়ু ছিল ২৭.১ ওভার।

গতির চেয়ে স্পিন দিয়েই প্রতিপক্ষকে বেশি কাবু করেছে ভারত। রবীন্দ্র জাদেজা ৩৩ রানে ৫টি ও কুলদীপ যাদব ৭ রানে ২টি উইকেট নেন। এছাড়া মোহাম্মদ শামি ২টি ও মোহাম্মদ সিরাজ ১টি উইকেট নেন। চলতি আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক কুইন্টন ডি কককে দ্বিতীয় ওভারেই বোল্ড করে সিরাজ প্রোটিয়াদের যে ট্রমার মধ্যে ফেলে দেন, সেখান থেকে আর বের হতে পারেনি ক্রিকেটের চিরায়ত ‘চোকার্স’খ্যাত দলটি। এরপর জাদেজা, যাদব ও শামি মিলে তেম্বা বাভুমার দলকে ছিন্নভিন্ন করেন। 

ভারত প্রথম পাওয়ার প্লে থেকে যে রান তুলেছে, প্রোটিয়ারা ১১ জন মিলেও তা করতে পারেননি! ভারত প্রথম ১০ ওভারে ১ উইকেটে তুলেছিল ৯১ রান, প্রোটিয়ারা ৮৩/১০! আবার কোহলির একার রানও করতে পারেননি বাভুমারা ১১ জন মিলে। 

টানা ৮ জয়ে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান নিশ্চিত হলো ভারতের। সমান ম্যাচে ১২ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা, যাদের গতকালই শেষ চার নিশ্চিত করার সুযোগ ছিল। শুক্রবার আহমেদাবাদে আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলবে প্রোটিয়ারা। আর ভারত রাউন্ড রবিন লিগের শেষ ম্যাচ খেলবে রোববার নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বেঙ্গালুরুতে। ১৫ নভেম্বর মুম্বাইতে প্রথম সেমিফাইনাল খেলবেন কোহলিরা। তাদের প্রতিপক্ষ টেবিলের চতুর্থ স্থানধারী দল। সেটি হতে পারে নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান কিংবা আফগানিস্তান। ১৬ নভেম্বর কলকাতায় দ্বিতীয় সেমিফাইনালে লড়বে টেবিলের দুই ও তিন নম্বর দল। 

গতকাল ইডেনে টস জিতে ব্যাটিং বেছে নেয় ভারত। শুরু থেকেই ব্যাটে ঝড় তোলা রোহিত শর্মাকে (২৪ বলে ৪০) ষষ্ঠ ওভারে সাজঘরে ফেরান কাগিসো রাবাদা (৬২/১)। পাওয়ার প্লেতে ৯১ রান তোলার পর দ্বিতীয় উইকেট হারায় ভারত। শুভমান গিলকে (২৩) বোল্ড করেন স্পিনার কেশব মহারাজ। চাপের মুখে শ্রেয়াস আইয়ারকে নিয়ে ১৫৮ বলে ১৩৪ রানের জুটি গড়েন কোহলি। তাতে বড় স্কোরের ভিতও পেয়ে যায় ভারত। দলীয় ২২৭ রানে ৮৭ বলে ৭৭ রানের ইনিংস খেলে লুঙ্গি এনগিডির শিকার হন শ্রেয়াস। এরপর লোকেশ রাহুল, সূর্যকুমার যাদব ও রবীন্দ্র জাদেজাকে নিয়ে তিনটি জুটি গড়ে কোহলিই দলের সংগ্রহ তিনশ পার করান।

অনবদ্য ব্যাটিং করা কোহলি ৪৯তম ওভারে কাগিসো রাবাদার বলকে কভার অঞ্চলে ঠেলে দিয়ে সিঙ্গেল নিয়ে ৪৯তম সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। তার সেঞ্চুরিতে ভর করে ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ৩২৬ রানের পুঁজি পায় ভারত। কোহলি ১২১ বলে ১০১ রানে অপরাজিত থাকেন। তিনি ইনিংসটি সাজান ১০ বাউন্ডারিতে। 

১৯৮৯ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ৪৬৩ ম্যাচে ৪৯টি সেঞ্চুরি করেন টেন্ডুলকার। অথচ কোহলি মাত্র ২৮৯ ম্যাচে তাকে ধরে ফেললেন। টেন্ডুলকার ৪৯তম সেঞ্চুরি করেছিলেন ৪৫১তম ইনিংসে, কোহলি তা করলেন মাত্র ২৭৭ ইনিংসে। ৩১টি সেঞ্চুরি করে সর্বকালের তালিকায় তিনে রয়েছেন ভারতীয় দলনায়ক রোহিত শর্মা। 

চলতি বিশ্বকাপ একাধিকবার শচীনকে স্পর্শ করার কাছাকাছি গিয়েও ব্যর্থ হচ্ছিলেন কোহলি। পুনেতে বাংলাদেশের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করা এ খেলোয়াড় তিন ম্যাচে যথাক্রমে ৯৫, ৮৮ ও ৮৫ রানে আউট হয়েছেন। অবশেষে গতকাল তিনি ৪৯তম সেঞ্চুরির দেখা পেলেন। 

কোহলি সেঞ্চুরি করার পর পরই তাকে অভিনন্দন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ শচীন পোস্ট দিয়েছেন, ‘ভালো খেলেছো বিরাট। এ বছর ৪৯ থেকে ৫০-এ যেতে আমার ৩৬৫ দিন লেগেছে। আশা করি, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তুমি ৪৯ থেকে ৫০-এ পৌঁছাবে এবং আমার রেকর্ড ভেঙে দেবে। অভিনন্দন।’

চলতি বিশ্বকাপে এটা কোহলির দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে চতুর্থ সেঞ্চুরি। সাতটি সেঞ্চুরি নিয়ে সবার শীর্ষে রোহিত শর্মা। চলতি আসরে দুটি সেঞ্চুরি ও চারটি ফিফটিতে ৫৪৩ রান করে চার্টের দুইয়ে কোহলি। শনিবার তাকে টপকে রান চার্টে দুইয়ে উঠেছিলেন নিউজিল্যান্ডের রাচিন রবীন্দ্র (৫২৩)। একদিন পরই দুইয়ে ফিরলেন ভারতের ব্যাটিং সুপারস্টার। দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্টন ডি কক গতকাল মাত্র ৫ রান করার পর ৫৫০ রান নিয়ে আছেন শীর্ষে। তার ব্যর্থতায় সেঞ্চুরিয়ান কোহলি শীর্ষস্থানের কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন। 

চলতি বছর দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন কোহলি। এখন পর্যন্ত চার সেঞ্চুরিতে এক হাজারেরও বেশি রান করেছেন ৭২.১৮ গড়ে। এ নিয়ে অষ্টমবার এক পঞ্জিকাবর্ষে হাজারের বেশি রান করলেন তিনি। এখানেও তিনি টপকে গেছেন শচীনকে, যিনি সাতবার বছরে হাজার রান করেছেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ভারত: ৫০ ওভারে ৩২৬/৫ (কোহলি ১০১*, শ্রেয়াস ৭৭, রোহিত ৪০, জাদেজা ২৯*; কেশব ১/৩০, রাবাদা ১/৪৮)। দক্ষিণ আফ্রিকা: ২৭.১ ওভারে ৮৩/১০ (ইয়ানসেন ১৪, ডুসেন ১৩; জাদেজা ৫/৩৩, যাদব ২/৭, শামি ২/১৮, সিরাজ ১/১১)। ফল: ভারত ২৪৩ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: বিরাট কোহলি (ভারত)।