শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর—তিন খাতেই চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) সরকারের রাজস্ব আহরণ প্রবৃদ্ধি কমেছে। এ সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্য নিয়েছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬ কোটি টাকা আহরণের। যদিও তারা রাজস্ব আহরণ করতে পেরেছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। সে হিসেবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ১১২ কোটি টাকা। গত ছয় মাসের রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষণ করে এ চিত্র দেখা গেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এভাবে চলতে থাকলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি থাকবে।

এনবিআরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ১৭ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুল্ক খাতে ৬ হাজার ৭৬৬ কোটি, ভ্যাটে ৬ হাজার ২৯৯ কোটি এবং আয় ও ভ্রমণ করে এসেছে ৪ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের (২০২১-২২) এ সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ। পরের মাস আগস্টে তা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ১২ শতাংশে। এ মাসে মোট রাজস্ব আহরণ হয় ২২ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুল্ক থেকে ৮ হাজার ৯৬ কোটি, ভ্যাট এসেছে ৮ হাজার ৭৩৩ কোটি এবং আয় ও ভ্রমণ কর আয় হয়েছে ৫ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা।

সেপ্টেম্বরে আবার আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশে। ২২ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ হয় অর্থবছরের তৃতীয় মাসে। শুল্ক খাতে ৭ হাজার ৫৯১ কোটি, ভ্যাটে ৯ হাজার ৫১৩ কোটি এবং আয় ও ভ্রমণ কর থেকে এ মাসে ৯ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা আদায় হয়। এছাড়া অক্টোবরে মোট রাজস্ব আহরণ হয় ২৩ হাজার ৭৯০ কোটি। এর মধ্যে শুল্ক খাতে ৭ হাজার ৪৮১ কোটি, ভ্যাট এসেছে ৯ হাজার ৬৫০ কোটি এবং আয় ও ভ্রমণ কর আয় হয়েছে ৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। নভেম্বরে রাজস্ব আহরণ হয় ২৪ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ১১ শতাংশ। এ মাসে মোট রাজস্ব আহরণ হয় ২৭ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের ডিসেম্বরে সংগ্রহ হয়েছিল ২৭ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বরে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫৯ কোটি টাকা কম রাজস্ব এসেছে।

গত ছয় মাসে শুধু আগস্টেই প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এমনটা হয়েছে। ওই মাসে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধিও বেশি ছিল। পরে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি ও ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধিও কমেছে। এছাড়া শুল্ক খাতে রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি জুলাইয়ের ৩৭ দশমিক ৬৮ থেকে কমে ডিসেম্বরে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ হয়েছে। ভ্যাট খাতে প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৫৬ থেকে পরের মাসে বেড়ে ১৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ হয়। পরে তা আবার ধারাবাহিকভাবে কমে ডিসেম্বরে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। আর আয় ও ভ্রমণ কর খাতে আগস্টের ১৮ দশমিক ৯৭ থেকে কমে ডিসেম্বরে হয় ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এনবিআর সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৯০ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ১৫ হাজার ১১২ কোটি টাকা। এ সময় ধারাবাহিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে রাজস্ব বেশি এসেছে ভ্যাট খাত থেকে। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার ৯৫ শতাংশই আয় হয়েছে। ৮২ শতাংশ আয় হয়েছে শুল্ক খাতে।

রাজস্ব সংগ্রহের প্রবৃদ্ধি কমার কারণ জানতে চাইলে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজস্ব আহরণ প্রবৃদ্ধি ক্রমেই নিম্নগামী, বিষয়টা সবাইকে ভাবাচ্ছে ও শঙ্কা তৈরি করছে। অর্থনীতির আকার অনুযায়ী ক্রমেই যেখানে তা বাড়ার কথা সেখানে বিপরীত চিত্র। সাদামাটা কারণ হিসেবে করোনার ধাক্কা বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলা হলেও এক্ষেত্রে এনবিআরের যে দায়িত্ব ছিল সেটা তারা পালনে সক্ষম হচ্ছে কিনা তা ভালো করে দেখতে হবে। দেশের অধিকাংশ মানুষ করের আওতায় আসে না এবং যারা কর দেন তারাও বেশি পরিমাণ ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া কী কারণে এনবিআর রাজস্ব আহরণ করতে পারছে না সেটা রাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরা দরকার। এনবিআর যদি জবাবদিহির আওতায় থাকত তাহলে সবাই জানতে পারত যে এ প্রতিষ্ঠান কেন পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ করতে পারছে না। এনবিআর যদি রাজস্ব আহরণ তার ভূমিকা না রাখতে পারে, সেটাও জনগণকে জানানো দরকার। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ অনুযায়ী সংস্কারে ব্রত না হয়ে নিজ থেকেই রাজস্ব আহরণ বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কার দরকার বলেও মনে করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রতি বাজেটেই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাকে বাড়িয়ে ধরা একটা রীতিতে পরিণত হয়েছে। এ বছর দেখা যাচ্ছে সব ক্যাটাগরিতেই প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। তবে মূল্যস্ফীতির কারণে রাজস্ব আয়ে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা। কারণ ন্যূনতম আয় তো বেড়েছে।’ রাজস্ব আয়ে সেটা দেখা যাচ্ছে না কেন, জানতে চাইলে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘কারা এ মূল্যস্ফীতির কারণে সুবিধা পাচ্ছেন, সেখানেই এর উত্তর আছে। মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধি অনেক কম। তবে এর প্রভাবে মুনাফা হয়েছে অনেক বেশি, যা উচ্চবিত্তদের হাতেই গেছে। সেটা ট্যাক্সে কোনো প্রভাব ফেলেনি। রাজস্ব প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি হওয়ার কথা, কিন্তু তা হচ্ছে না।’