বেঙ্গালুরুতে গতকাল ডেভিড ওয়ার্নার ও মিচেল মার্শের সেঞ্চুরিতে ভর করে পাকিস্তানকে ৩৬৮ রানের বড় টার্গেট ছুড়ে দেয় অস্ট্রেলিয়া। এ বিশ্বকাপেই শ্রীলংকার বিপক্ষে ৩৪৫ রানের টার্গেট সফলভাবে চেজ করে রেকর্ড গড়ে পাকিস্তান। গতকাল নিজেদেরই গড়া রেকর্ড নতুন করে লেখার চ্যালেঞ্জে ব্যর্থ হয় বাবর আজমের দল। হাই স্কোরিং এ ম্যাচে জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত ২৭ বল বাকি থাকতে ৩০৫ রানে গুটিয়ে গিয়ে ৬২ রানে হেরেছে পাকিস্তান। এ জয়ে সেমিফাইনালের রেসে ফিরল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া।
বড় রান চেজ করতে নেমে আব্দুল্লাহ শফিক ও ইমাম-উল-হক উদ্বোধনী জুটিতে ২১ ওভারে ১৩৪ রান তুলে দিলে জয়ের আশা জাগে পাকিস্তানের। এ সময় অজিদের ব্রেক থ্রু এনে দেন মিডিয়াম পেসার মার্কাস স্টয়নিস। শফিক ৬১ বলে ৬৪ রান করে স্টয়নিসের বলে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে ক্যাচ দেন। এরপর ইমাম-উল-হক খুব দ্রুতই সাজঘরে ফেরেন। ২৪তম ওভারে ওই স্টয়নিসের বলেই মিচেল স্টার্ককে ক্যাচ দেন তিনি (১৫৪/২)। আউট হওয়ার আগে ৭১ বলে ৭০ রান করেন ১০ বাউন্ডারিতে।
এরপর অ্যাডাম জাম্পার ঘূর্ণিতে এলোমেলো পাকিস্তান। ওয়ানডে র্যাংকিংয়ের এক নম্বর ব্যাটার বাবর আজম টানা হতাশ করে চলেছেন দলকে। কাল তিনি ১৪ বলে ১৮ রান করে জাম্পার শিকার হন। এরপর মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সৌদ শাকিলের কাঁধেই ছিল দলের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব। শাকিলকে (৩১ বলে ৩০) ফিরিয়ে ৫৭ রানের এ জুটি ভাঙেন অধিনায়ক প্যাট কামিন্স।
এরপর ইফতিখার আহমেদকে নিয়েও লড়ে যান রিজওয়ান। কিন্তু অজিদের আরেকটি আঘাত। ২০ বলে ২৬ রান করা ইফতিখারকে লেগ বিফোরের ফাঁদে ফেলেন জাম্পা। রিজওয়ান ছিলেন বলে এর পরও জয়ের আশা জ্বলছিল। কিন্তু শ্রীলংকা ম্যাচের মতো কাল ত্রাতা হতে পারলেন না রিজওয়ান। ৪০ বলে ৪৬ রান করে তিনি জাম্পার বলে লেগ বিফোর হন (২৭৪/৬)।
নিজের পরের ওভারে শেষ স্বীকৃত ব্যাটার মোহাম্মদ নওয়াজকেও স্টাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলেন জাম্পা। এটি ছিল গতকাল তার চতুর্থ শিকার। এছাড়া উসামা মির, শাহিন শাহ আফ্রিদি ও হাসান আলীর উইকেটগুলো ভাগাভাগি করেন জস হ্যাজেলউড, স্টার্ক ও কামিন্স।
টস জিতে অজিদের ব্যাটিং দেয় পাকিস্তান। তবে বাবর আজমের সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করে অজিদের ১৭৬ বলেই ২০০ রান এনে দেন ওয়ার্নার ও মার্শ। এ দুজন বিনা উইকেটে ২৫৯ রান তোলার পর শেষ দিকে দারুণভাবে ফিরে আসেন পাকিস্তানের বোলাররা। এর পরও ৯ উইকেটে ৩৬৭ রান তুলে নেয়ার কৃতিত্ব দেখায় অজিরা।
পরপর দুই বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ওয়ার্নার ও মার্শ। নওয়াজের করা ৩১তম ওভারের চতুর্থ বলটি লং-অনে পাঠিয়ে এক রান নিয়ে তিন অঙ্কে পৌঁছান ওয়ার্নার। ৮৫ বলে সেঞ্চুরি তুলে নেন ওয়ার্নার। এটা তার ২১তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চার ম্যাচেই সেঞ্চুরি করলেন তিনি!
পরের বলে সুইপার কভারে বাউন্ডারি মেরে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন মার্শ। তিনি ঠিক ১০০ বলে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেঞ্চুরি তুলে নেন। গতকাল ৩২তম জন্মদিনে সেঞ্চুরি উদযাপন করলেন রডনি মার্শপুত্র।
ওয়ার্নার ১২৪ বলে ১৬৩ ও মার্শ ১০৮ বলে ১২১ রান করে অস্ট্রেলিয়াকে রানসৌধ গড়ে দেন। ওয়ার্নার ১৪টি বাউন্ডারি ও ৯টি ছক্কায় সাজান ইনিংসটি। আর মার্শ ১০টি বাউন্ডারি ও ৯টি ছক্কা হাঁকান।
শেষ দিকে শাহিন শাহ আফ্রিদি (৫/৫৪) ও হারিস রউফ (৩/৮৩) দ্রুত অজিদের উইকেট তুলে নিলে সংগ্রহ চারশ হয়নি। শেষ ৫ ওভারে ২৭ রান দিয়ে ৪ উইকেট তুলে নেয় পাকিস্তান। ২০৩ বলে বিনা উইকেটে ২৫৯ রান থেকে শেষ পর্যন্ত ৩৬৭/৯। অন্যভাবে বললে, ৩০ ওভার শেষে সংগ্রহ ছিল ২০৮/০। পরের ২০ ওভারে অজিরা তুলেছে ১৫৯/৯!
পঞ্চম ওভারে শাহিনের বলে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন ওয়ার্নার। উসামা মির সেই ক্যাচ হাত থেকে ফেলে দেন। জীবন পেয়ে পরে আরো ১৫৩ রান যোগ করেছেন ওয়ার্নার। এভাবে ম্যাচটাই ফেলে দেন উসামা।
ওয়ার্নার ও মার্শ বেশকিছু রেকর্ডের সঙ্গী হলেন। তাদের ২৫৯ রান বিশ্বকাপে দ্বিতীয় সেরা ওপেনিং পার্টনারশিপ। সর্বোচ্চ ২৮২ রানের পার্টনারশিপের রেকর্ডটা শ্রীলংকার তিলকারত্নে দিলশান ও উপুল থারাঙ্গার।
বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো জুটি পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০০ প্লাস রান তুলল। আগের রেকর্ডটা ব্রায়ান লারা ও ডেসমন্ড হাইনসের ১৭৫ রান (১৯৯২ বিশ্বকাপ)। এটা বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় সেরা পার্টনারশিপ। সর্বোচ্চ ২৬০ রানের পার্টনারশিপ ওয়ার্নার ও স্টিভ স্মিথের (২০১৫ বিশ্বকাপ, প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান)।
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ও সব মিলিয়ে পঞ্চম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে পাঁচটি সেঞ্চুরি করলেন ওয়ার্নার। রিকি পন্টিং ও কুমার সাঙ্গাকারারও পাঁচটি করে সেঞ্চুরি। পাঁচটির বেশি সেঞ্চুরি আছে শুধু রোহিত শর্মা (৭) ও শচীন টেন্ডুলকারের (৬)।
টানা দুই হারের পর টানা দুই জয় অজিদের। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানকে টপকে টেবিলের চারে উঠে গেল কামিন্সের দল। পাকিস্তান টানা দুই জয়ের পর টানা দুই ম্যাচে হারল। ৪ ম্যাচ শেষে দুই দলেরই সংগ্রহ সমান ৪ পয়েন্ট। শীর্ষ তিনে আছে নিউজিল্যান্ড (৮), ভারত (৮) ও দক্ষিণ আফ্রিকা (৪)।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া: ৫০ ওভারে ৩৬৭/৯ (ওয়ার্নার ১৬৩, মার্শ ১২১; আফ্রিদি ৫/৫৪, হারিস ৩/৮৩)। পাকিস্তান: ৪৫.৩ ওভারে ৩০৫ (ইমাম-উল-হক ৭০, শফিক ৬৪, রিজওয়ান ৪৬; জাম্পা ৪/৫৩, স্টয়নিস ২/৪০, কামিন্স ২/৬২)। ফল: অস্ট্রেলিয়া ৬২ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: ডেভিড ওয়ার্নার (অস্ট্রেলিয়া)।










