মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে গতকাল বিশ্বকাপ ম্যাচে শ্রীলংকাকে ৩০২ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে সবার আগে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিল ভারত। আগে ব্যাটিং করে তিন ফিফটিতে ৮ উইকেটে ৩৫৭ রান তোলে স্বাগতিকরা। জবাব দিতে নেমে মোহাম্মদ শামি, মোহাম্মদ সিরাজ ও জসপ্রীত বুমরাহর আগুন ঝরানো বোলিংয়ের সামনে অসহায় সিংহলিজরা মাত্র ৫৫ রানে অলআউট হয়ে লজ্জাজনক হার বরণ করে।
রানের হিসাবে ওয়ানডেতে এটা চতুর্থ বৃহত্তম জয়। সর্বোচ্চ ৩১৭ রানের জয়টিও ভারতের এবং সেটিও শ্রীলংকারই বিপক্ষে পাওয়া। এ বছর কেরালায় ভারতের বিপক্ষে ৩৯১ রান তাড়া করতে নেমে ৭৩ রানে গুটিয়ে যায় সিংহলিজরা। গত সেপ্টেম্বরে কলম্বোয় এশিয়া কাপ ফাইনালে মোহাম্মদ সিরাজ ৬ উইকেট নিলে শ্রীলংকা ৫০ রানে অলআউট হয়। এবার বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে আরেকবার ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখোমুখি দ্বীপদেশটি।
বিশ্বকাপে রানের হিসাবে এটা দ্বিতীয় বৃহত্তম জয়। চলতি বিশ্বকাপেই নেদারল্যান্ডসকে ৩০৯ রানে হারিয়ে নিজেদের রেকর্ডটা নতুন করে লেখায় অস্ট্রেলিয়া। আগের ২৭৫ রানের জয়ের রেকর্ডটাও ছিল অস্ট্রেলিয়ার।
শ্রীলংকার ৫৫ রান ওয়ানডে ইতিহাসে দশম সর্বনিম্ন দলীয় সংগ্রহ ও ওয়ানডে বিশ্বকাপে চতুর্থ সর্বনিম্ন সংগ্রহ। সর্বনিম্ন ৩৬ রানের রেকর্ডটা কানাডার দখলে এবং সেটি শ্রীলংকার বিপক্ষে। গতকাল টেল-এন্ডের চেষ্টায় ওয়ানডেতে নিজেদের সর্বনিম্ন স্কোরটা (৪৩) টপকে যেতে সমর্থ হয় কুশল মেন্ডিসের দল। বিশ্বকাপে এটাই শ্রীলংকার সর্বনিম্ন সংগ্রহ। আগের সর্বনিম্ন স্কোর ছিল ৮৬।
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ২০১১ সালের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ভারত ও শ্রীলংকা। ওই ম্যাচে সিংহলিজদের হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ মুকুট জিতেছিল ভারত। সেই মাঠে গতকাল মুখোমুখি হয় ভারত-শ্রীলংকা। এ ম্যাচে টস হেরে আগে ব্যাটিং করতে নামা ভারত বিরাট কোহলি, শুভমান গিল ও শ্রেয়াস আইয়ারের ফিফটিতে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ৩৫৭ রান তুলতে সমর্থ হয়।
ভারতীয় অধিনায়ক রোহিত শর্মা ইনিংসের প্রথম বলেই বাউন্ডারি মেরে সূচনা করেন। যদিও দিলশান মাদুশঙ্কার পরের বলেই তিনি বোল্ড! এরপর বিরাট কোহলি ও শুভমান গিলের ১৮৯ রানের দুর্দান্ত এক জুটিতে সংহত অবস্থানে চলে যায় স্বাগতিকরা। গিল ৯২ বলে ১১টি চার ও দুই ছক্কায় ৯২ রান করে মাদুশঙ্কার শিকার হন। মাদুশঙ্কা পরের ওভারে ফেরান কোহলিকেও। সাজঘরে ফেরার আগে ৯৪ বলে ১১ বাউন্ডারিতে ৮৮ রান করেন তিনি।
সেঞ্চুরির আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত তিন অঙ্ক ছোঁয়া হলো না গিল ও কোহলির। যদিও এ ইনিংসের জন্যও তারা লংকানদের ধন্যবাদ দিতেই পারেন! ইনিংসের শুরুর দিকে দুজনই জীবন পান। শুরুর দিকে মাদুশঙ্কার বলে গিল কভারে ক্যাচ দিলেও তা তালুবন্দি করতে পারেননি চারিথ আসালঙ্কা। কোহলি ব্যক্তিগত ১০ রানের সময় মাদুশঙ্কাকে রিটার্ন ক্যাচ দিলেও তিনি তা হাতে জমাতে ব্যর্থ হন। জীবন পেয়েই এ দুজন প্রায় ২০০ রানের জুটি গড়েন।
কোহলি ও গিলের পর লংকানদের ওপর কর্তৃত্ব করেন শ্রেয়াস আইয়ার। ৩২তম ওভারে নেমেও সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগান তিনি। যদিও ব্যাটে ঝড় তুলে মাত্র ৫৬ বলে ৩ চার ও ৬ ছক্কায় ৮২ রান করে মাদুশঙ্কার শিকার হয়ে ফেরেন সাজঘরে। শেষ দিকে ২৪ বলে ৩৫ রান করে ভারতের সংগ্রহটা বড় করায় ভূমিকা রাখেন রবীন্দ্র জাদেজা।
পেসার মাদুশঙ্কা ৮০ রানে ৫ উইকেট নেন। শেষ ওভারে রানআউট হন মোহাম্মদ শামি ও জাদেজা।
শচীন টেন্ডুলকারের ৪৯তম সেঞ্চুরির রেকর্ডটা এবারো ছোঁয়া হলো না কোহলির। তবে ৮৮ রান করার পথে বেশকিছু মাইলফলকে পা রাখেন তিনি। গতকাল ৩৪ রান করার মধ্য দিয়ে চলতি বছর হাজার রান পূর্ণ করেন তিনি। ক্যারিয়ারে এ নিয়ে অষ্টমবার বছরে হাজার রান করলেন তিনি। শচীন টেন্ডুলকার করেছিলেন সাতবার। চলতি বছর পাথুম নিশাঙ্কা, শুভমান গিল ও রোহিত শর্মার পর চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে এক হাজার রান পূর্ণ করলেন কোহলি।
ব্যাটারদের গড়ে দেয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে দাপুটে জয় তুলে নেয় ভারত। আগুন ঝরানো বোলিং করেন শামি, সিরাজ ও বুমরাহ। শামি ১৮ রানে ৫ উইকেট শিকার করে বিশ্বকাপে ভারতের সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ড গড়েন। জহির খানকে (৪৪ উইকেট) টপকে বিশ্বকাপে দেশের হয়ে শামির উইকেট এখন সবচেয়ে বেশি। ওয়ানডেতে ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ চারবার ৫ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখালেন তিনি। ওয়ানডে বিশ্বকাপে মিচেল স্টার্কের সঙ্গে যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ তিনবার নিলেন ৫ উইকেট।
এছাড়া সিরাজ ১৬ রানে তিনটি ও বুমরাহ আট রানে একটি উইকেট নেন। স্পিনার রবীন্দ্র জাদেজার শিকার একটি উইকেট।
চলতি আসরে এখন পর্যন্ত একমাত্র অপরাজিত দল ভারত। তারা ৭ ম্যাচের সবক’টি জিতে ১৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষস্থানে রয়েছে। সমান ম্যাচে ১২ পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। গতকালই প্রোটিয়াদের হটিয়ে শীর্ষে উঠে যায় রোহিত শর্মার দল। অন্যদিকে, ৬ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলেল সাতে অবস্থান করছে শ্রীলংকা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ভারত: ৫০ ওভারে ৩৫৭/৮ (শুভমান ৯২, কোহলি ৮৮, শ্রেয়াস ৮২, জাদেজা ৩৫; মাদুশঙ্কা ৫/৮০)। শ্রীলংকা: ১৯.৪ ওভারে ৫৫/১০ (কাসুন ১৪, ম্যাথুস ১২, থিকসানা ১২; শামি ৫/১৮, সিরাজ ৩/১৬)। ফল: ভারত ৩০২ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মোহাম্মদ শামি (ভারত)।










