ত্রয়োদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপে একের পর এক অঘটনের জন্ম দিয়েছে আফগানিস্তান। গতকাল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে আরেকটি রূপকথা লিখতে যাচ্ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পারেনি এদিন। হাশমতউল্লাহ শহিদির লড়াকু দলটিকে হতবিহ্বল করে দিয়ে হার না মানা ডাবল সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়াকে সেমিফাইনালে তুলে দেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। এ যেন রূপকথাকেও হার মানানো এক ইনিংস।
৫ উইকেটে ২৯১ রানের সংগ্রহ গড়া আফগানরা ৯১ রানে প্রতিপক্ষের ৭ উইকেট তুলে নিয়ে জয়ের স্বপ্নই দেখছিল। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হলো ম্যাক্সওয়েলের লড়াই। ১২৮ বলে ২০১ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলে তিনিই লিখলেন বিশ্বকাপের নতুন রূপকথা। দলকে হারের মুখ থেকে টেনে তোলার পর শেষ দিকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ব্যাট করে দলকে জেতান তিনি। অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে নিয়ে অষ্টম উইকেটে ২০২ রানের পার্টনারশিপ গড়ে দলকে জেতান তিনি। এই জুটিতে কামিন্সের অবদান ১২, আর ম্যাক্সওয়েলের ১৭৯! ম্যাক্সওয়েল বীরত্বে ১৯ বল ও ৩ উইকেট হাতে রেখে অভাবনীয় এক জয় পায় পাঁচবারের বিশ্বজয়ীরা।
গতকালের এ জয়ে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার পর তৃতীয় দল হিসেবে এবারের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে নাম লেখাল অজিরা (১২ পয়েন্ট)। আফগানরা জিতলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে এক পা দিয়ে রাখত। তবে তাদের সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি। নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ত্রিমুখী লড়াই হবে শেষ চারের বাকি এক টিকিটের জন্য। তিন দলেরই ঝুলিতে সমান ৮ পয়েন্ট। বৃহস্পতিবার নিউজিল্যান্ড খেলবে শ্রীলংকার বিপক্ষে, শুক্রবার আফগানিস্তান খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে, শনিবার পাকিস্তানের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। শনিবার বাংলাদেশের বিপক্ষে রাউন্ড রবিন লিগের শেষ ম্যাচ খেলবে অস্ট্রেলিয়া।
গতকালের জয়ের পথে একাধিক নতুন রেকর্ড গড়েছেন ম্যাক্সওয়েল। দেশের হয়ে নিজের সর্বোচ্চ ওয়ানডে স্কোর, ওয়ানডেতে নিজের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি, বিশ্বকাপ ইতিহাসে মার্টিন গাপটিল ও ক্রিস গেইলের পর তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি, কুইন্টন ডি ককের ১৭৪ রান টপকে চলতি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস, বিশ্বকাপে রান তাড়া করার সময় সর্বোচ্চ ইনিংস খেলার মতো অবিশ্বাস্য সব কীর্তি গড়েছেন ৩৫ বছর বয়সী ম্যাক্সওয়েল।
৪৬৯৬ ওয়ানডে ম্যাচের ইতিহাসে ৬ কিংবা তার নিচে ব্যাট করা কোনো খেলোয়াড়ের এটাই সর্বোচ্চ ইনিংস। এছাড়া ওয়ানডেতে কোনো অস্ট্রেলিয়ানের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি এবং বিশ্বকাপে তৃতীয় ডাবল। কামিন্সের সঙ্গে তার ২০২ রানও অষ্টম কিংবা তার পরের যেকোনো উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটি।
মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে গতকাল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার সামনে ছিল নির্ভীক এক আফগানিস্তান। টস জিতে আগে ব্যাটিং বেছে নেয়া আফগানরা ইব্রাহিম জাদরানের ১২৯ রানের হার না মানা ইনিংসে ভর করে ৫০ ওভারে ৫ উইকেটে ২৯১ রান তুলেছে।
অষ্টম ওভারে রহমানুল্লাহ গুরবাজ আউট হয়ে যাওয়ার পর রহমত শাহ, হাশমতউল্লাহ শহিদি, আজমতুল্লাহ ওমরজাই ও রশিদ খানকে সঙ্গে নিয়ে দলের সংগ্রহ তিনশর কাছাকাছি নিয়ে যান জাদরান। এ পথে তিনি খেলেন ১৪৩ বলে ১২৯ রানের রাজসিক এক ইনিংস। বিশ্বকাপে এটাই কোনো আফগান ব্যাটারের প্রথম সেঞ্চুরি। ৮টি চার ও ৩টি ছক্কায় ইনিংসটি সাজান ইব্রাহিম। এছাড়া রশিদ খান ১৮ বলে হার না মানা ৩৫, রহমত শাহ ৩০ ও শহিদি ২৬ রান করেন।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে চতুর্থ কনিষ্ঠতম হিসেবে সেঞ্চুরি করলেন জাদরান। ২১ বছর ৩৩০ দিন বয়সে সেঞ্চুরি করেন জাদরান। তার চেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি করেছেন আয়ারল্যান্ডের পল স্টার্লিং (২০ বছর ১৯৬ দিন), রিকি পন্টিং (২১ বছর ৭৬ দিন) ও আভিস্কা ফার্নান্দো (২১ বছর ৮৭ দিন)।
ব্যাটিংয়ের পর বোলিংয়েও চমক দেখান সেমির স্বপ্নে বিভোর আফগানরা। নবীন-উল-হক, আজমতুল্লাহ ওমরজাইয়ের গতি ও রশিদের ঘূর্ণিতে বিপাকেই পড়ে অজিরা। ৯১ রানে ৭ উইকেট হারায় তারা। যদিও অঘটন হতে দিলেন না ম্যাক্সওয়েল। জাদরানের কীর্তি গড়া সেঞ্চুরি ও বোলারদের অবিশ্বাস্য প্রচেষ্টা—সবই বিফলে গেল ম্যাক্সওয়েলের বীরত্বের কাছে।
ম্যাক্সওয়েল পায়ের ক্র্যাম্প নিয়ে লড়ে গেলেন শেষ পর্যন্ত। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে মাঠেই শুয়ে পড়লেন। দীর্ঘক্ষণ চিকিৎসা নেয়ার পর উঠে দাঁড়ান, ব্যাট করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দৌড়াতে পারছিলেন না বলে অসংখ্যবার সিঙ্গেল নেয়ার সুযোগ থাকলেও নেননি, ভরসা করেন শুধু চার ও ছক্কার ওপর। কাজটা ছিল অত্যন্ত কঠিন, তবু তিনি নিজের ওপর আস্থা রাখলেন। কামিন্সের দায়িত্ব ছিল শুধু উইকেটের এক প্রান্ত আগলে রাখা। রান তোলার বাকি কাজটা বীরত্বের সঙ্গে করেন ম্যাক্সওয়েল। চোট নিয়েই একের পর এক চার-ছক্কায় বেসামাল করে তোলেন ওমরজাই, রশিদকে। কখনো ট্রেডমার্ক পাওয়ার শট, কখনো রিভার্স সুইপ খেলে রশিদদের হতাশার সাগরে ভাসান তিনি। অবশেষে ম্যাক্সওয়েলই হাসলেন শেষ হাসি।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
আফগানিস্তান: ৫০ ওভারে ২৯১/৫ (ইব্রাহিম জাদরান ১২৯, রশিদ ৩৫*, রহমত ৩০; হ্যাজেলউড ২/৩৯)। অস্ট্রেলিয়া: ৪৬.৫ ওভারে ২৯৩/৭ (ম্যাক্সওয়েল ২০১*, মার্শ ২৪, ওয়ার্নার ১৮, লাবুশেন ১৪, কামিন্স ১২*; রশিদ ২/৪৪, নবীন ২/৪৭, ওমরজাই ২/৫২)। ফল: অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (অস্ট্রেলিয়া)।










