টি২০ বিশ্বকাপে ২০০৭ সাল থেকে টানা পাঁচ হারের পর ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাটিতে বিরাট কোহলির ভারতকে ১০ উইকেটে হারায় পাকিস্তান। সেই জয়ে উজ্জীবিত বাবর আজমের দল ওয়ানডে বিশ্বকাপেও ভারতের বিপক্ষে হারের বৃত্ত ভাঙার স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু এবারো হলো না। জমল না ক্রিকেটের এ মহারণ। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে গতকাল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে পরাজিত হয় পাকিস্তান। তাও ১৯.৩ ওভার বাকি থাকতে! ওয়ানডে বিশ্বকাপে এ নিয়ে আটবারের মুখোমুখিতে কখনই জেতা হলো না পাকিস্তানের। স্কোরলাইন এখন ৮-০!
পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গতকাল টস হেরে ব্যাটিং করতে নামা পাকিস্তান স্বাগতিকদের শক্ত বোলিংয়ের মুখে ১৯১ রানে গুটিয়ে যায়। শুরুটা ভালো করেও আকস্মিক বিপর্যয়ে লণ্ডভণ্ড অতিথি দলের ব্যাটিং লাইনআপ।
ভারতের বোলিংয়ের কোনো জবাব জানা ছিল না পাকিস্তানি ব্যাটারদের। পেস ব্রিগেডে জসপ্রীত বুমরাহ, মোহাম্মদ সিরাজ, হার্দিক পান্ডিয়া এবং স্পিন অ্যাটাকে কুলদীপ যাদব ও রবীন্দ্র জাদেজার নিখুঁত বোলিংয়ের সামনে পর্যুদস্ত বাবর আজমের দল। এ পাঁচ বোলারের প্রত্যেকেই নিয়েছেন সমান দুটি করে উইকেট।
উদ্বোধনী জুটিতে আব্দুল্লাহ শফিক ও ইমাম-উল-হক ৪১ রান তুলে বিচ্ছিন্ন হন। মোহাম্মদ সিরাজের বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়েন আগের ম্যাচে অভিষেকে সেঞ্চুরি করা শফিক (২০)। দ্বিতীয় উইকেটে ইমামকে নিয়ে ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করছিলেন বাবর। ইমাম ব্যক্তিগত ৩৬ রানে পান্ডিয়ার শিকার হন। এরপর তৃতীয় উইকেটে বাবর (৫৮ বলে ৫০) ও মোহাম্মদ রিজওয়ান (৬৯ বলে ৪৯) দারুণ এক জুটিতে ম্যাচে ফেরান পাকিস্তানকে। যদিও বাবরকে বোল্ড করে ১০৩ বলে ৮২ রান তোলা এ জুটি ভাঙেন সিরাজ।
এরপর বুমরাহ, কুলদীপ, জাদেজাদের ভয়ংকর বোলিং আগ্রাসনের মুখে পরের ১৬ রানের মধ্যে ৫ উইকেট হারায় পাকিস্তান। তাতে স্কোরটা ১৫৫/২ থেকে দেখতে না দেখতেই হয়ে যায় ১৭১/৭। বুমরাহ ৩৪তম ওভারের শেষ বলে বোল্ড করেন আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান রিজওয়ানকে। পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ায় স্কোরটা শেষ পর্যন্ত ১৯১ রানে গিয়ে থেমে যায়। ১৩ ওভারের মধ্যে (৩০ থেকে ৪৩) মাত্র ৩৬ রান তুলতে ৮ উইকেট হারায় পাকিস্তান।
ব্যাটিংয়ের এ ক্ষত আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি পাকিস্তান। ব্যাটিং শক্তিধর ভারত ঠিকই দাপট দেখিয়ে টানা তৃতীয় জয় তুলে নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে উঠে যায়। ব্যাটিংয়ে নেতৃত্ব দেন অধিনায়ক রোহিত শর্মা।
ডেঙ্গুজ্বর থেকে সেরে উঠে দলে ফেরা শুভমান গিল দলীয় ২৩ রানের সময় শাহিন আফ্রিদির শিকার হলেও তাতে দমে যায়নি ভারত। বরং রোহিত শর্মার আগ্রাসন চলতে থাকে। বিরাট কোহলিকে নিয়ে দ্বিতীয় উইকেটে ৪২ বলে যোগ করলেন ৫৬ রান। ১০ ওভারেই ৭৯ রান তুলে নেয় ভারত। ১৯৯৯ সাল থেকে মাত্র একটি দলই এর চেয়ে বেশি রান করেছে পাকিস্তানের বিপক্ষে এবং সেই দলটি ভারত (২০০৩ বিশ্বকাপ)।
কোহলি ১৮ বলে ১৬ রান করে হাসান আলীর শিকার হওয়ার পর তৃতীয় উইকেটে শ্রেয়াস আইয়ারকে সঙ্গী করে ৭১ বলে ৭৭ রান যোগ করেন রোহিত। এ পথে মাত্র ৩৬ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন রোহিত, যিনি আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করেন ৬৩ বলে।
মারমুখী ব্যাটিং করা রোহিত বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় ও রেকর্ড অষ্টম সেঞ্চুরির সম্ভাবনা তৈরি করেও ১৪ রান দূরে থাকতে আউট হয়ে যান শাহিন আফ্রিদির শিকার হয়ে। আউট হওয়ার আগে ৬টি চার ও ৬টি ছক্কায় ৬৩ বলে করেন ৮৬ রান। এরপর লোকেশ রাহুলকে (১৯*) নিয়ে ৫৩ বলে ৩৬ রান যোগ করে ভারতের জয় নিশ্চিত করেন শ্রেয়াস। মোহাম্মদ নওয়াজকে বাউন্ডারি মেরে ভারতের জয় নিশ্চিত করা শ্রেয়াস ৬২ বলে ৫৩ রান করে অপরাজিত থাকেন।
ব্যাটারদের হাতে ভারতের জয় নিশ্চিত হলেও এ জয়ের ভিতটা গড়ে দেন বোলরারা। ৭ ওভারে ১ মেডেনসহ ১৯ রানের খরচায় ২ উইকেট শিকার করা রহস্যময় বোলার বুমরাহ পেয়েছেন ম্যাচসেরার পুরস্কার।
ওয়ানডে ফরম্যাটে পাকিস্তান ৭৩ জয় নিয়ে এগিয়ে থাকলেও ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতকে হারানোর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না পাকিস্তান। বিশ্বকাপে প্রথম দেখা ১৯৯২ সালে। সেবার পাকিস্তান বিশ্বকাপ জিতলেও সিডনিতে গ্রুপ ম্যাচে ভারতের কাছে হেরেছে ৪৩ রানে। এ ধারা পরে চলতেই থাকে। বিশ্বকাপে পরের সব ম্যাচেই হেরে যায় পাকিস্তান। ১৯৯৬ সালে ৩৯ রানে, ১৯৯৯ সালে ৪৭ রানে, ২০০৩ সালে ৬ উইকেটে, ২০১১ সালে ২৯ রানে, ২০১৫ সালে ৭৬ রানে ও ২০১৯ সালে ডিএলএস মেথডে ৮৯ রানের জয় পায় ভারত। এবার ভারতের মাটিতে ভারতকে হারানোর স্বপ্নও পূরণ হলো না।
গতকাল জয়শেষে ভারতীয় দলনায়ক রোহিত কৃতিত্ব দিলেন বোলারদের। তার কথায়, ‘বোলাররাই আজ আমাদের জয়ের ভিতটা গড়ে দেন। তাদের ১৯০ রানে আটকে দেয়াটা দারুণ প্রচেষ্টার ফল। এটা কিন্তু ১৯০-এর পিচ নয়। আমরা ভাবছিলাম, তারা ২৮০-২৯০ করে ফেলবে। কিন্তু আমাদের বোলাররা যে বোলিংয়ে এসেছে, সে নিজের দায়িত্বটা পালন করেছে দারুণভাবে।’
১৯ অক্টোবর পুনেতে বাংলাদেশের মুখোমুখি হবে ভারত। পরদিন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলবে পাকিস্তান।
তিন ম্যাচে পূর্ণ ৬ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে ভারত (১.৮২১)। এরপর নিউজিল্যান্ড (৬ পয়েন্ট, নিট রানরেট ১.৬০৪), দক্ষিণ আফ্রিকা (৪ পয়েন্ট, নিট রানরেট ২.৩৬০) ও পাকিস্তান (৪ পয়েন্ট, নিট রানরেট -০.১৩৭)।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
পাকিস্তান: ৪২.৫ ওভারে ১৯১/১০ (বাবর ৫০, রিজওয়ান ৪৯, ইমাম ৩৬, শফিক ২০; বুমরাহ ২/১৯, পান্ডিয়া ২/৩৪, কুলদীপ ২/৩৫, জাদেজা ২/৩৮, সিরাজ ২/৫০)। ভারত: ৩০.৩ ওভারে ১৯২/৩ (রোহিত ৮৬, শ্রেয়াস ৫৩*, লোকেশ ১৯*; শাহিন ২/৩৬, হাসান আলী ১/৩৪)। ফল: ভারত ৭ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: জসপ্রীত বুমরাহ (ভারত)।










