এই ধরাধামে আবির্ভাব ঘটেছে ফুটবলের গুটিকয়েক দেবদূতের। সেই অভিজাত ক্লাবে বহু আগেই নাম লিখিয়েছেন লিওনেল মেসি। পেলে আর ম্যারাডোনার মতো ফুটবলের কুলীনদের সঙ্গেই তার নামটি উচ্চারিত হয়। তবে বিশ্বকাপ ট্রফি নেই, তাই তাকে কেউ কেউ ইতিহাসের সেরাদের কাতারে রাখতে চান না। এবার স্থায়ীভাবেই ওইসব কিংবদন্তির পাশে বসার সুযোগ এসেছে। কাতারে বিশ্বকাপের ট্রফি থেকে আর এক জয় দূরে এ ফুটবলার। শৈশবে জটিল রোগে জীবন ও খেলা—দুটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়া সেই মেসি এখন ফুটবলে অমরত্বের পথে।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে মেসির শোকেসটা ট্রফি আর নানা পুরস্কারে ঠাসা। সেখানে অপূর্ণতা বলতে শুধু বিশ্বকাপ ট্রফিটিই অনুপস্থিত। গৌরবের এ ট্রফি ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে জিতেছেন তিনবার, আর্জেন্টিনার নয়নমণি ম্যারাডোনা একবার। কাতারে বিশ্বকাপ জিতে সেই অপূর্ণতাটুকু ঘুচিয়ে দেয়ার শেষ সুযোগ এসেছে মেসির সামনে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ঐন্দ্রজালিক পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলার পর তাকেই ইতিহাসের সেরা ফুটবলার মেনে নিচ্ছেন অনেকে, কিন্তু ফুটবলের এ জাদুকরের জীবনটা অন্য রকমও হতে পারত।
আর্জেন্টিনার রোজারিওতে ১৯৮৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি। বাবা হোর্হে কাজ করতেন ইস্পাত কারখানায়, মা ছিলেন পার্টটাইম ক্লিনার। স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলির হয়ে পাঁচ বছরেই ফুটবলে হাতেখড়ি মেসির। শৈশবেই তার প্রতিভা চোখে পড়ে সবার। তাকে লুফে নেয় নিওয়েল’স ওল্ড বয়েজ ক্লাব। ফুটবলে মেসির কারিকুরি ও জাদুকরী মুভ যখন মুগ্ধ করছিল সবাইকে, তখনই ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোনজনিত জটিল রোগ। তার পরিবারের পক্ষে ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে নেয়া সম্ভব ছিল না। আর্জেন্টিনার খ্যাতিমান ক্লাব রিভার প্লেট মেসিকে দলে নিতে আগ্রহ দেখালেও সপ্তাহে ৯০০ ডলার চিকিৎসা ব্যয় বহনে অপারগতা প্রকাশ করে। সেই দুঃসময়ে আবির্ভাব বার্সেলোনার। স্প্যানিশ ক্লাবটির তখনকার ক্রীড়া পরিচালক কার্লোস রেক্সাস মেসির প্রতিভা সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি মেসির খেলা দেখেও মুগ্ধ হন। হাতের কাছে কোনো কাগজ না পেয়ে তিনি একটি ন্যাপকিন পেপারে মেসির বাবার সঙ্গে চুক্তি সই করেন। তার চিকিৎসার সব ব্যয়ভার বহন করতে রাজি হয় বার্সা। এরপর ১৩ বছর বয়সে মেসিকে নিয়ে স্পেনে পাড়ি জমান তার বাবা। মেসি যোগ দেন বার্সেলোনার একাডেমি ‘লা ম্যাসিয়া’য়। এরপর কাতালান ক্লাবটির হয়ে যা করেছেন তা শুধুই ইতিহাস। সব রেকর্ড ভেঙেচুরে নতুন সব রেকর্ড গড়েছেন।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল মেসির ক্যারিয়ারের ১০০২তম। সিনিয়র ফুটবলে তিনি ৭৯১ গোল করেছেন, অ্যাসিস্ট করেছেন ৩৪০টি। সাতবার জিতেছেন বিশ্বসেরার পুরস্কার ‘ব্যালন ডি’অর’, একবার জিতেছেন ‘ফিফা বেস্ট প্লেয়ার’ পুরস্কার। এছাড়া বার্সেলোনার হয়ে ১০টি লা লিগা ও চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপাসহ মোট ৩৫টি শিরোপা জয় করেছেন। ফরাসি ক্লাব পিএসজির দুটি শিরোপা জয়ের গৌরবের অধিকারী হয়েছেন আর্জেন্টাইন এ সুপারস্টার। ২০১৪ সালে দলের কাণ্ডারি হয়ে লড়েছেন শেষ পর্যন্ত, যদিও শিরোপার লড়াইয়ে তীরে গিয়ে তরী ডোবে আর্জেন্টাইনদের। দেশের হয়ে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা শিরোপা জিতেছেন মেসি।
মঙ্গলবার ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে বল নিয়ে ঐশ্বরিক এক প্রচেষ্টার পর পাস বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সতীর্থ হুলিয়ান আলভারেজকে। ২২ বছর বয়সী আলভারেজ তা থেকে গোল করতে ভুল করেননি। তবে গোলদাতা নয়, গোলের উৎস মেসির জাদুকরী সে মুহূর্তে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আছে। বল নিয়ে তার রানিং, ড্রিবলিং, বাঁকবদল ও চলতি আসরের সেরা ডিফেন্ডারখ্যাত জসকো গার্ডিওলকে একাধিকবার বোকা বানানোর পর রেশমি ছোঁয়ায় যে কাট ব্যাকটি দিয়েছেন আলভারেজকে উদ্দেশ করে, তা যেন কোনো শিল্পীর তুলির আঁচড়। এ গোলেই ক্রোয়াটদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন আলভারেজ।
আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের পর বিশ্বজুড়ে এখন শুধুই মেসিবন্দনা। বলা হচ্ছে, এরই মধ্যে যা করেছেন তাতে বিশ্বকাপ না জিতেও তিনি অমর হয়ে থাকবেন। জয় শেষে মেসির গুরু লিওনেল স্ক্যালোনি বলছিলেন, ‘আমি কথাটি বহুদিন ধরেই বলে এসেছি। তার ট্রেনিং দেখভাল করাটা আমার জন্য সম্মানের। মেসির ব্যাপারে আর কী-ই বলার আছে—তাকে স্কোয়াডে দেখাটাও সৌভাগ্যের।’
ইংলিশ গ্রেট অ্যালান শিয়ারার বলেন, ম্যারাডোনা ও মেসিকে নিয়ে বিতর্কের কি সমাপ্তি হলো? ম্যারাডোনা বিশ্বকাপ জিতেছেন, মেসি জিততে পারেননি। তিনি যদি এখানে জিতে যান, তবে তিনিই এগিয়ে থাকবেন। মেসির কারণেই আর্জেন্টিনা ফাইনালে। তার ওপরই সবার চোখ। সে অতীতে যতটা কঠোর পরিশ্রম করেছে তা কিন্তু এখন করছে না কিংবা আগের মতো গতিও নেই। কিন্তু আগের সেই ম্যাজিক, মুভ করার সেই সামর্থ্য, ড্রিবলিং ও বল নিয়ে ছুটে ডিফেন্ডারদের কাটানোর সামর্থ্য ঠিকই রয়ে গেছে।
মেসির সাবেক সতীর্থ পাওলো জাবালেতা বলেন, ‘মেসি অবিশ্বাস্য। সেই টার্ন, আর ওইসব জায়গায় মেসি খুবই বিপজ্জনক। যখন সে বক্সের মধ্যে থাকে তখন আপনি তাকে স্পর্শ করতে চাইবেন না। আলভারেজের ট্যাপ-ইন করার জন্য এটা ছিল অবিশ্বাস্য এক পাস। অভাবনীয় এক গোল। যখনই মেসির কাছে বল যায়, তখনই মনে হয় কিছু না কিছু ঘটবে।’
মেসির বন্ধু ও সাবেক সতীর্থ লুই সুয়ারেজ তাকে নিয়ে বলছিলেন, ‘তুমি যে বিশ্বের সেরা, সেটি প্রমাণ করতে কখনই ক্লান্তি নেই তোমার।’
ক্রোয়েশিয়ার কোচ জ্লাতকো দালিচের মুখেও মেসিবন্দনা। তিনি মনে করেন মেসির কারণেই তারা হেরেছেন। এ কোচের কথায়, মেসির ব্যাপারে খুব বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই। সে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় এবং আজ (মঙ্গলবার) খুবই বিপজ্জনক ছিল। এ মেসিকেই সবাই দেখতে চায়।
ক্রোয়েশিয়াকে হারানোর পর মেসি বলেছেন, ‘আমি খুবই খুশি যে বিশ্বকাপের ফাইনাল দিয়ে আমার যাত্রার সমাপ্তি ঘটবে, শেষ ম্যাচটিও ফাইনাল। এটা সত্যিই আনন্দের। এবার যাতে ঘটে সেটি নিশ্চিত করতে আমরা আমাদের সেরাটাই দেয়ার চেষ্টা করছি।’
২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলেও দুই মাস পর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তিনি। সেই মেসি এখন কাতারের সবুজ গালিচায় ফুল ফোটাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমি গত কয়েকটা বছর জাতীয় দলের সঙ্গে খেলাটা উপভোগ করছি। কোপা জয়, ৩৬ ম্যাচে অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপ খেলতে আসা, এরপর ফাইনালে ওঠা। সবকিছুই অবিশ্বাস্য।’
২০০৫ সালে ১৮ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক মেসির। সেই থেকে ১৭২ ম্যাচ খেলে তিনি করেছেন ৯৭ গোল। এ পথে অসংখ্য রেকর্ড ভেঙে গড়েছেন নতুন রেকর্ড। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ১১ গোল করেছেন ক্রোয়েশিয়া ম্যাচেই। এ দিন তিনি টপকে যান গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতাকে (১০ গোল)। বিশ্বকাপের ইতিহাসে যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ ২৫ ম্যাচ খেলার গৌরবের অধিকারী মেসি। ফাইনালে মাঠে নামলেই জার্মানির লোথার ম্যাথিউসকে পেছনে ফেলে ২৬ ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়বেন ৩৫ বছর বয়সী মেসি।
এ বিশ্বকাপে গতকাল ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচের আগ পর্যন্ত যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ পাঁচ গোল মেসির, অ্যাসিস্ট করেছেন চারটি গোলে। একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে কোনো আসরের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্টের রেকর্ড গড়েন মেসি। এছাড়া বিশ্বকাপে টিনএজ, বিশ ও ত্রিশের কোটায় গোল করা একমাত্র খেলোয়াড়ও তিনি। আর্জেন্টিনার জার্সিতে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোল তো রয়েছেই। এভাবেই অসংখ্য রেকর্ড মেসির নামের পাশে।
তাই মেসিকে নিয়ে আর কোনো সংশয় দেখেন না ইংলিশ গ্রেট গ্যারি লিনেকার। সর্বকালের সেরার প্রশ্নে তিনি টুইট করেছেন, আর কি কোনো বিতর্কের অবকাশ রয়েছে?










