গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জ ও এর আশপাশের এলাকার ডায়িংসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় ৮-১০ দিন ধরে নারায়ণগঞ্জের ৪৫০টি ডায়িংসহ শিল্প-কারখানায় কাজ করতে পারছেন না শ্রমিকরা। কারখানা মালিকদের দাবি, প্রয়োজনে জোনভিত্তিক সপ্তাহে দুই-একদিন বন্ধ রেখে বাকি দিনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করার। অন্যথায় নিটওয়ার এক্সপোর্ট কার্যক্রমে ধস নামবে।

এ বিষয়ে নিট পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন একেবারেই বন্ধ রয়েছে। দিনে বা রাতে কোনো সময়ই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। রফতানি অব্যাহত রাখতে হলে বিদেশ থেকে ফ্যাব্রিকস আমদানি করতে হবে। এতে ডলার সংকট বাড়বে, রিজার্ভ আরো কমে আসবে এবং আমদানি ব্যয় বাড়বে।’

যদিও এ সংকট সাময়িক বলে দাবি করেছেন তিতাস গ্যাসের এমডি হারুনুর রশিদ মোল্লা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের পাইপলাইনে গ্যাসের চাহিদা ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে আমরা সরবরাহ পাচ্ছি ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংকট আছে। তবে অচিরেই সংকট কেটে যাবে।’

তিতাস গ্যাস অফিস সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের শিল্প-কারখানা ও বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাহিদা ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ন্যাচারাল বা পাইপলাইনে গ্যাসের চাহিদা ৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। আর এলএনজির চাহিদা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু চাহিদার তুলনায় ন্যাচারাল গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজি মোটেও পাওয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ঘোড়াশাল সার কারখানায় উৎপাদনের জন্য এবং নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে বেসরকারি খাতের একটি নতুন ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসবে। এজন্য গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এ কারণে নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।

ফতুল্লা স্টেডিয়াম-সংলগ্ন ইউরোটেক্সা নিটওয়্যার গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল হোসেন জানান, সরকার নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস দিয়ে প্রতি ইউনিট ১১ থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করেছে। তার পরও গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। বিশেষ করে ৮-১০ দিন ধরে ২৪ ঘণ্টায় গ্যাস মিলছে না। আমাদের কারখানা কম্পোজিট প্রজেক্ট। এখানে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। গ্যাস সংকটে ডিজেল দিয়ে ডায়িং কারখানায় উৎপাদন করা গেলেও স্ট্যান্ডার্ড ও ড্রাক করা যাচ্ছে না। আর ফ্যাব্রিকস ডায়িং করাতে না পেরে সুইং, ফিনিশিং, নিটিং অ্যান্ড প্রিন্টিং সেকশনের শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে প্রতি মাসে কারখানা থেকে ১০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য বিদেশে রফতানি হয়। এখন তা নেমে এসেছে ৫ মিলিয়ন ডলারে।

তিনি বলেন, ‘ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি। কিন্তু এখন চোখের সামনে গ্যাস সংকটে সেই প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা ঋণের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ব।’

এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে ফ্যাব্রিকস উৎপাদন বা ডায়িং করাতে না পারায় সুইং, প্রিন্টিং ও ফিনিশিং সেকশনের শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়টির সমাধান চান ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, এভাবে চলতে থাকলে রফতানি কমে আসবে। দেশের রিজার্ভ আরো সংকটের মধ্যে পড়বে। শ্রমিকরা কারখানায় অলস সময় পার করছেন। এতে মালিকের লোকসান হচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি, মালিক লোকসানে পড়লে তাদের বেতন দিতে পারবেন না।

বাংলাদেশ ডায়িং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ আমজাদ হুসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস সংকটে ১৫ দিন ধরে নারায়ণগঞ্জে ৪৫০টি ডায়িং কারখানায় উৎপাদন এক প্রকার বন্ধ রয়েছে। যার উৎপাদনক্ষমতা বা ডায়িং ক্যাপাসিটি ৩০ টন ফ্যাব্রিকস সে উৎপাদন করছে মাত্র এক বা দুই টন। বৈদেশিক মুদ্রার ৮৫ শতাংশ আয় হয় গার্মেন্টস খাত থেকে।’ তাই গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানান এ ব্যবসায়ী নেতা।