এশিয়া কাপে বাংলাদেশের কাছে হারের দুদিন পরই ফাইনালে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এক ভারতকে দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। সাকিবদের কাছে হারের কষ্ট দ্রুতই ভুলে ফাইনালে স্বাগতিক শ্রীলংকার দুঃস্বপ্ন ডেকে আনল রোহিত শর্মার দল। বলা উচিত, লংকানদের দুঃস্বপ্ন আনলেন মোহাম্মদ সিরাজ। এ ডানহাতি পেসার এক ওভারে ৪ উইকেটসহ মোট ৬ ব্যাটসম্যানকে শিকার করে স্বাগতিকদের অলআউট করেন মাত্র ৫০ রানে। এরপর কোনো উইকেট না হারিয়ে ৬ দশমিক ১ ওভারে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় এশিয়া কাপের ‘রাজা’রা।
আগেই সর্বোচ্চ সাতবার শিরোপাজয়ী ভারত কাল এশিয়া কাপে অষ্টম শিরোপা জিতে নিল। ছয়টি শিরোপা জিতে তাদের পরই শ্রীলংকা। আর পাকিস্তান শিরোপা জিতেছে দুবার। ২০১৮ সালে আরব আমিরাতের মাটিতে ফাইনালে বাংলাদেশকে হারিয়ে সপ্তম শিরোপা জেতে ভারত। ২০২২ সালে পরের আসরে টি২০ ফরম্যাটে চ্যাম্পিয়ন হয় শ্রীলংকা। দুবাই ফাইনালে হারায় পাকিস্তানকে। এশিয়া কাপে শিরোপা পুনরুদ্ধার করল ভারত।
নিজেদের দুর্গ কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে সিংহলিজরা শিরোপা জেতার আশায় খেলতে নামে। ব্যাটিং উইকেট দেখেই টস জিতে আগে ব্যাটিং নেন দাসুন শানাকা। কিন্তু এরপর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হলে খেলা শুরু হতে ৪০ মিনিট বিলম্ব হয়। টসের আগে বৃষ্টি হলে নিশ্চিতভাবেই ব্যাটিংটা আগে নিতেন না শানাকা। কেন নিতেন না, তা বুঝতে দেরি হলো না। বৃষ্টির পর ব্যাটিংয়ে নেমে মাত্র ১২ রানের মধ্যেই ৬ উইকেট হারিয়ে বসে সিংহলিজরা। এর মধ্যে পাঁচটিই নেন গতি বোলার সিরাজ। ইনিংসের তৃতীয় ওভারেই তিনি শিকার করেন চার চারটি উইকেট!
শুরুটা অবশ্য করেছিলেন স্টার পেসার জসপ্রিত বুমরাহ। প্রথম ওভারের তৃতীয় বলে তার সুইংয়ে বোকা বনে যান কুশল পেরেরা। উইকেটকিপার লোকেশ রাহুলকে ক্যাচ দিয়ে তিনি ফেরেন সাজঘরে। এরপর সিরাজের সংহার মূর্তি দেখল প্রেমাদাসা। তৃতীয় ওভারে চারটি ও চতুর্থ ওভারে পঞ্চম উইকেট শিকার করেন সিরাজ। তরুণ অলরাউন্ডার দুনিত ভেল্লালাগেকে নিয়ে বিপর্যয় খানিকটা সামাল দেয়ার চেষ্টা করছিলেন কুশল মেন্ডিস। ১২তম ওভারে দুর্দান্ত এক গোলায় তাকে বোল্ড করেন সিরাজ (৩৩/৭)!
এরপর আর স্বীকৃত কোনো ব্যাটার ছিল না শ্রীলংকার। শেষের তিন ব্যাটারকে (মূলত বোলার) সহজ শিকারে পরিণত করেন ভারতীয় দলের সহঅধিনায়ক হার্দিক পান্ডিয়া। ১৪ বলে ৩ রান খরচ করে ৩ উইকেট নেন পান্ডিয়া। লংকান ইনিংসে কুশল মেন্ডিসের ১৭ রানই সর্বোচ্চ, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩ রান করেন মহিশ থিকসানার চোটে দলে আসা দুশান হেমন্ত।
লক্ষ্যটা ছোট হওয়ায় ওপেনিংয়ে আর নামেননি রোহিত শর্মা। শুভমান গিলের সঙ্গে ইশান কিশানকে পাঠিয়ে দেন তিনি। শুভমান ১৯ বলে ২৭ ও ইশান ১৮ বলে ২৩ রান করে ভারতের দাপুটে জয় নিশ্চিত করেন।
৬০০ বলের ম্যাচটি শেষ হয়ে মাত্র ১২৯ বলে, যা তৃতীয় সংক্ষিপ্ততম ওয়ানডে। ২০২০ সালে কীর্তিপুরে মাত্র ১০৪ বলে শেষ হয়েছিল নেপাল ও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ। ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েকে ১২০ বলের মধ্যে হারিয়েছিল শ্রীলংকা। ওয়ানডের সংক্ষিপ্ত পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে চারটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে শ্রীলংকার নাম। এর মধ্যে তিনটি তারা জিতেছে, আর একটি হার।
কাল শঙ্কা ছিল ওয়ানডের সর্বনিম্ন রানের রেকর্ড ৩৫-এর আগেই না অলআউট হয়ে যায় শ্রীলংকা। কিন্তু এ লজ্জায় পড়েনি সিংহলিজরা। নিজেদের সর্বনিম্ন ৪৩ রানও টপকে যেতে সমর্থ হয় শানাকার দল। তবু কিছু লজ্জা এড়াতে পারেনি তারা। সিরাজের বোলিং তোপে লংকানরা ষষ্ঠ উইকেট হারায় মাত্র ১২ রানে। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা ছাড়া এত কম রানে ৬ উইকেট হারায়নি কেউ। ২০১২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৩ রানে ৬ উইকেট হারিয়েছিল তিলকারত্নে দিলশানের দল। এবার নিজেদের সেই রেকর্ডটি ভাঙল শ্রীলংকা।
টেস্ট খেলুড়ে দেশের বাইরে অবশ্য এমন কিংবা এর চেয়েও খারাপ নজির আছে। ২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ১২ রানে কানাডার ৬ উইকেট তুলে নিয়েছিল শ্রীলংকা। ২০১৩ সালে ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ১০ রানের মধ্যে ৬ উইকেট হারিয়েছিল কানাডা। ম্যাচটি ছিল ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগ চ্যাম্পিয়নশিপের।
নাটকীয়তায় ভরা ষোড়শ এশিয়া কাপের ফাইনালে ওঠে ভারত ও শ্রীলংকা। এশিয়া কাপে এটি ছিল শ্রীলংকার দ্বাদশ ও ভারতের দশম ফাইনাল। দুটি দল এ নিয়ে অষ্টমবারের মতো শিরোপাযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। জমজমাট লড়াইয়ের আভাস মিললেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিরোধের মুখেই পড়ল না রোহিত শর্মার দল, ঘরের মাঠে আসন্ন বিশ্বকাপ সামনে রেখে যা ভারতের জন্য বিরাট টনিক হিসেবে কাজ করবে।
টুর্নামেন্টে শুভমান গিল সর্বোচ্চ ৩০২ রান করেন, সর্বোচ্চ ১১ উইকেট নেন শ্রীলংকার মাথিসা পাথিরানা। যদিও ৯ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টসেরা হয়েছেন ভারতের স্পিনার কুলদীপ যাদব। আর ফাইনাল ম্যাচসেরার রেসে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সিরাজ।
ফাইনালে এভাবে লজ্জাজনক পরাজয় শেষে শ্রীলংকার কোচ ক্রিস সিলভারউড বলেন, ‘আমরা যেভাবে আউট হয়েছি তা খুবই দুঃখজনক। আমি মনে করি, আজ আমরা উচ্চমানের একটি বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে খেলেছি, বিশেষ করে সিরাজ ছিল অসাধারণ। একই সঙ্গে বলব, আমরা নিজেরাই নিজেদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছি। আমরা কিছু তরুণ বোলার পেয়েছি, যারা জ্বলে উঠেছে। আমরা দেখেছি সাদিরা সামারাবিক্রমা ভালো খেলে, অন্য আরো অনেকে। কিন্তু সবই ছিল হতাশাজনক।’
সংক্ষিপ্ত স্কোর—
শ্রীলংকা: ১৫.২ ওভারে ৫০/১০ (কুশল মেন্ডিস ১৭, হেমন্ত ১৩*; সিরাজ ৬/২১, পান্ডিয়া ৩/৩)। ভারত: ৬.১ ওভারে ৫১/০ (শুভমান ২৭*, ইশান ২৩*)। ফল: ভারত ১০ উইকেটে জয়ী। ম্যাচসেরা: মোহাম্মদ সিরাজ (ভারত)। টুর্নামেন্টসেরা: কুলদীপ যাদব (ভারত)।










