দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে গতকাল ২৭২ রানের পুঁজি নিয়ে লড়াইয়ের স্বপ্নই কি দেখছিল আফগানিস্তান? কিন্তু প্রতিপক্ষ যে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যাটিং শক্তিধর ভারত। তাই দিল্লির ময়দানে গতকাল লড়াই আর হলো না, একপেশে ম্যাচে ৮ উইকেটে জিতেছে ভারত, তাও ১৫ ওভার হাতে রেখে। অধিনায়ক রোহিত শর্মা ৮৪ বলে ১৩১ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলে ভারতকে বড় জয় এনে দেয়ার পাশাপাশি গড়েছেন একগুচ্ছ রেকর্ড।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ছক্কা, ভারতের চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে বিশ্বকাপে হাজার রান—গতকাল এমন অনেক রেকর্ড ও মাইলফলকের সঙ্গে নিজের নাম লেখান ৩৬ বছর বয়সী রোহিত।
২৭৩ রানের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে নেমে উদ্বোধনী জুটিতেই রোহিত ও ইশান কিশান ১৮.৪ ওভারে ১৫৬ রান তুলে দিলে আফগানদের লড়াইয়ের সব আশা শেষ হয়ে যায়। এ জুটিতে রোহিতের একার অবদানই ৬৫ বলে ১০২! ইশান ৪৭ বলে ৪৭ রান করে রশিদ খানের শিকার হন। দ্বিতীয় উইকেটে কোহলির সঙ্গে ৪২ বলে ৪৯ রান তুলে সাজঘরের পথ ধরেন রোহিতও। স্পিন জাদুকর রশিদের বলে বোল্ড হয়ে যান তিনি।
অবশ্য ততক্ষণে আফগানদের ক্ষতি যা করার করে ফেলেছেন ‘হিটম্যান’ রোহিত। আর নিজের নামটি লিখিয়েছেন রেকর্ডবুকে। এরপর কোহলি ও শ্রেয়াস আইয়ার ৫৬ বলে ৬৮ রানের জুটিতে ভারতের জয় নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়েন। কোহলি ৫৬ বলে ছয় বাউন্ডারিতে ৫৫ ও শ্রেয়াস ২৩ বলে এক বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন।
এর আগে আফগান ইনিংসে ছিল হাশমতউল্লাহ শহিদি, আজমতউল্লাহ ওমরজাই আর জসপ্রীত বুমরাহর বীরত্বের গল্প। ভারতীয় পেস তোপের মুখে ৬৩ রানে ইব্রাহিম জাদরান, রহমানুল্লাহ গুরবাজ ও রহমত শাহ আউট হয়ে গেলে মিডল অর্ডারে দৃঢ়তা দেখান শহিদি ও ওমরজাই। ১২৮ বলে ১২১ রানের জুটিতে দলের সংগ্রহটা সংহত করেন দুজন। ঢাকার লিগে পরিচিত মুখ ও নিয়মিত পারফর্ম করা ওমরজাই দুই বাউন্ডারি ও চার ছক্কায় ৬৯ বলে ৬২ রান করে ফেরেন সাজঘরে।
অধিনায়ক শহিদি আট বাউন্ডারি ও এক ছক্কায় ৮৮ বলে ৮০ রান করে দলের সংগ্রহ ২০০ পার হতে সাহায্য করেন। এরপর মোহাম্মদ নবি (১৯), রশিদ খান (১৬) ও মুজিব-উর-রহমান (১০*) দলের সংগ্রহটা ২৭২ পর্যন্ত নিয়ে যান। প্রথম উইকেট শিকার করা বুমরাহ আফগানদের পতন হওয়া শেষ তিনটি উইকেটও নেন। সব মিলিয়ে ১০ ওভারে ৩৯ রান খরচায় তার শিকার ৪ উইকেট। রোহিতের রেকর্ডের দিন বুমরাহর ফর্মে ফেরাও ভারতের জন্য বড় খবর।
যদিও আরেক শীর্ষ পেসার মোহাম্মদ সিরাজ ৯ ওভারে ৭৬ রান দিয়ে থাকেন উইকেটশূন্য। সহ-অধিনায়ক হার্দিক পান্ডিয়া ২ উইকেট নেন ৪৩ রান দিয়ে। শার্দূল ঠাকুর ও কুলদীপ যাদব নেন একটি করে উইকেট।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত বিরাট কোহলি ও লোকেশ রাহুলের অনবদ্য জুটিতে ভর করে জিতে যায় ভারত। অজি বধে উজ্জীবিত স্বাগতিকরা গতকাল দ্বিতীয় ম্যাচে গুঁড়িয়ে দেয় আফগানিস্তানকে, যারা প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের কাছে হেরেছে।
এর আগে ওয়ানডেতে মাত্র তিনবার ভারতের মুখোমুখি হয় আফগানরা। এর মধ্যে ভারত দুটিতে জয় পায়, একটি ম্যাচ ‘টাই’ হয়। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে এশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে খেলেছে আফগানরা। বাকি লড়াইটা বিশ্বকাপে। ২০১৯ সালে সাউদাম্পটনের সেই ম্যাচে আফগানিস্তানকে ১১ রানে হারায় ভারত। বৈশ্বিক আসরে গতকাল দ্বিতীয়বারের মতো পরাশক্তি ভারতের মুখোমুখি হয় আফগানিস্তান। এ লড়াইয়ে র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দলটির কাছে ৯ নম্বর দল অসহায় আত্মসমর্পণ করল।
ভারতের জয়ের ম্যাচটি ছিল রোহিতময়। ইএসপিএনক্রিকইনফো টুইট করে তাকে বলছে ‘বিশ্বকাপের দানব’। বিশ্বকাপে ১৯ ম্যাচে ৬৫.২৩ গড়ে ও ঠিক ১০০ স্ট্রাইক রেটে ১ হাজার ১০৯ রান করেছেন তিনি। সাতটি সেঞ্চুরির সঙ্গে ফিফটি করেছেন তিনটি। সর্বোচ্চ ইনিংস ১৪০ রানের।
১৯৯২ থেকে ২০১১ বিশ্বকাপ পর্যন্ত মোট ৪৪ ম্যাচে ছয়টি সেঞ্চুরি করেন মাস্টার ব্লাস্টার শচীন টেন্ডুলকার। রোহিত মাত্র ১৯ ম্যাচে করলেন সাতটি সেঞ্চুরি। ২০১৫ থেকে ২০১৯ দুটি বিশ্বকাপেই ছয়টি সেঞ্চুরি করেন তিনি। এর মধ্যে গত আসরেই করেন পাঁচটি। চলমান আসরে গতকাল আফগানদের বিপক্ষে ৬৩ বলে তিন অংক ছুঁয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক সেঞ্চুরির মালিক হয়ে গেলেন ভারতীয় দলনায়ক। এদিন ভারতের হয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডও গড়েন তিনি। ৭২ বলে আগের দ্রুততম সেঞ্চুরিটি ছিল বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক কপিল দেবের।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরি করার দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ছক্কা মারার রেকর্ডও নিজের করে নিলেন রোহিত। ক্যারিবিয়ান সুপারস্টার ক্রিস গেইল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মোট ৪৮৩ ম্যাচে ৫৫৩ ছক্কা মেরে রেকর্ড ধরে রেখেছিলেন। ৪৫২ ম্যাচে ৫৫১ ছক্কা হাঁকিয়ে গেইলের পরেই ছিলেন রোহিত। গতকাল আফগানদের বিপক্ষে পাঁচটি ছক্কা মেরে গেইলের রেকর্ডটা নিজের করে নেন ভারতীয় দলনায়ক। তার নামের পাশে এখন ৫৫৬ ছক্কা।
এদিন চতুর্থ ভারতীয় হিসেবে এক হাজার রানও করেছেন রোহিত। গতকাল তার দরকার ছিল ২২ রান। তিনি করলেন ১৩১ রান। এখন তার রান ১ হাজার ১০৯। হাজার রান পূর্ণ করার সঙ্গে সঙ্গে বিরাট কোহলিকে (১০৩০ রান) টপকে তিনি উঠে গেলেন দ্বিতীয় স্থানে। ২ হাজার ২৭৮ করে শীর্ষে শচীন। সৌরভ গাঙ্গুলী ১ হাজার ৬ রান নিয়ে নেমে গেলেন চারে।
আরো কিছু মাইলফলক হাতছানি দিচ্ছে রোহিতকে। পঞ্চম ভারতীয় হিসেবে ১৮ হাজার রানের মাইলফলকের সামনে তিনি। এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সব ফরম্যাটে ১৭ হাজার ৭৭৩ রান তার। আর ২২৭ রান করতে পারলে ১৮ হাজার রানের মাইলফলকে পৌঁছবেন এ ডানহাতি ব্যাটিং সুপারস্টার।
টেন্ডুলকার মোট ৬৬৪ ম্যাচে ৩৪ হাজার ৩৫৭ রান করে তালিকার শীর্ষে। ৫০৯ ম্যাচে ২৫ হাজার ৯০৭ রান করে কোহলি দ্বিতীয় স্থানে। এ তালিকার তিন নম্বরে ভারতীয় দলের হেড কোচ রাহুল দ্রাবিড়। ৫০৯ ম্যাচে তার রান ২৪ হাজার ২০৮। ৪২৪ ম্যাচে ১৮ হাজার ৫৭৫ রান করে পঞ্চম সৌরভ গাঙ্গুলী।
গতকাল জয় শেষে রোহিত বললেন, ‘বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি পাওয়া সবসময়ই বিশেষ কিছু। আমি অবশ্য রেকর্ডের কথা খুব বেশি ভাবি না। এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। কাজেই আমি মনঃসংযোগ হারাতে চাই না। শুরুতে ছন্দ পাওয়া ও তা পরবর্তী সময়ে ধরে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
টানা দুই জয়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচের প্রস্তুতি সেরে রাখল ভারত। পাকিস্তানও তুলে নিয়েছে টানা দুই জয়। শনিবার আহমেদাবাদে ভারত-পাকিস্তান মহারণ। আফগানরা দিল্লিতেই অবস্থান করবে। এ মাঠে রোববার তারা খেলবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
আফগানিস্তান: ৫০ ওভারে ২৭২/৮ (শহিদি ৮০, ওমরজাই ৬২; বুমরাহ ৪/৩৯, পান্ডিয়া ২/৪৩)। ভারত: ৩৫ ওভারে ২৭৩/২ (রোহিত ১৩১, ইশান ৪৭, রোহিত ৫৫*, শ্রেয়াস ২৫*; রশিদ ২/৫৭)। ফল: ভারত ৮ উইকেটে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: রোহিত শর্মা (ভারত)।










