দেশে স্কিন কেয়ার ও কালার কসমেটিকস পণ্যের বাজার রয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার, যার সিংহভাগই আমদানি করা হয়। বিদেশ থেকে অধিক মূল্যে এসব পণ্য আনা হলেও শুল্কায়নের সময় কম মূল্য দেখানো হয়। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। রাজস্ব ফাঁকির পাশাপাশি এ খাতে টাকা পাচার করা হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। তাই এ শিল্পে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে এর কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতি সুবিধা দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, দেশের বাজারে বিদেশী লিপস্টিকের দাম ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। কিন্তু আমদানির সময় আন্ডার ইনভয়েসিং করে পণ্যটির ট্যারিফ ভ্যালু দেখানো হয় মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ টাকা। শুল্কারোপের পর সেসব লিপস্টিকের দাম দাঁড়ায় ১০-১১ টাকা। যদিও এসব পণ্য অধিক মূল্যে আমদানি করা হয়। কমিশনের মতে, কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্য আমদানিতে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে ফাঁকি দেয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। ভোক্তাদের কাছ থেকে করা হচ্ছে অস্বাভাবিক মুনাফা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্য আমদানি হয়েছে ৫২৮ কোটি টাকার। এর সম্পূরক শুল্ক ও মূসকের পরিমাণ ছিল ২৪২ কোটি টাকা। এছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬২৭ কোটি টাকার কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্য আমদানি করা হয়েছে, সম্পূরক শুল্ক ও মূসকের পরিমাণ ছিল ২৮৮ কোটি টাকার। ফলে স্থানীয় বাজারের যে পরিধি তা বিবেচনায় আমদানি পর্যায়ে সরকারের রাজস্বের পরিমাণ নগণ্য বলে মনে করে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। বাজার বিবেচনায় এসব পণ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ের মূসক আদায় করা গেলে তা বিদ্যমান রাজস্ব অপেক্ষা অনেক বেশি হবে বলে কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

জার্মানির গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিস্টার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে কালার কসমেটিকসের বাজার রয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকার এবং স্কিন কেয়ার পণ্যের বাজার ২১ হাজার কোটি টাকার। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ২০-৩৯ বছরের নারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৭৪ লাখ ৬২ হাজার। এ জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশকে এ পণ্যের টার্গেট কাস্টমার ধরে গবেষণাটি করা হয়েছে।

ট্যারিফ কমিশনের তথ্যানুযায়ী, কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্য উৎপাদনে দেশে স্থানীয়ভাবে কোনো প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান নেই। তবে কয়েকটি অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান কালার কসমেটিকসের বিভিন্ন অংশ এনে প্যাকেটজাত করে। কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের পণ্যের প্যাকেজিংসামগ্রী ও কনটেইনার আমদানি করেছে। এছাড়া দেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও আমদানিবহির্ভূত কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্যসামগ্রীর অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য রয়েছে। তাই এ খাতের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে এবং স্থানীয় বাজারে উৎপাদিত কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প সুরক্ষায় সম্প্রতি সুপারিশসহ একটি মতামত প্রতিবেদন এনবিআরকে দিয়েছে ট্যারিফ কমিশন। তারা মনে করে, নির্দিষ্ট শর্তে বিশেষ এসআরও জারির মাধ্যমে এসব পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে কাঁচামাল আমদানি, স্থানীয় উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে শুল্ক ও কর কাঠামোয়ে পরিবর্তন আনা যেতে পারে। এতে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য বন্ধ হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও ব্যাপক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠবে।      

এ খাতে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে বলে মনে করেন অ্যাসোসিয়েশন অব স্কিন কেয়ার অ্যান্ড বিউটি প্রডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স ও এক্সপোর্টার্স অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিনও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমান যে আমদানি হচ্ছে বা এনবিআর যে রাজস্ব পাচ্ছে সেটা এ সেক্টরের আসল চিত্র নয়। বাস্তবে এ আমদানীকৃত পণ্যের দাম আরো অনেক বেশি। তাই এখানে বড় ধরনের অমিল রয়েছে। সরকারের এখানে আরো অনেক বেশি রাজস্ব পাওয়ার কথা। স্থানীয় পর্যায়ে যদি এ শিল্প গড়ে ওঠে তাহলে আমদানির পরিমাণ ও বাজারের আকারের সঙ্গে বড় এ অমিল আর থাকবে না। এক্ষেত্রে সরকার থেকে কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সুবিধা পাওয়া গেলে অনেক প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ করবে। একই সঙ্গে দেশে উৎপাদিত পণ্য বিদেশেও রফতানি করা যাবে এবং বর্তমান আমদানির জন্য যে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হচ্ছে তা সাশ্রয় হবে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্য আমদানিতে উচ্চহারে শুল্কারোপ হলেও ট্যারিফ মূল্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অনেক কম। তাই এ খাত থেকে সরকারের যে পরিমাণ রাজস্ব পাওয়ার কথা তা পাচ্ছে না। এ শিল্পকে সরকার শিশুশিল্প হিসেবে বিবেচনা করে স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট মেয়াদে সম্পূরক শুল্ক অব্যাহতি এবং মূসক শুধু বিক্রি পর্যায়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করে আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে অব্যাহতি দিতে পারে। এছাড়া কালার কসমেটিকসের ক্ষেত্রে নিট ওয়েটের পরিবর্তে গ্রস ওয়েটে বিবেচনায় শুল্কায়ন করলে সরকারের রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়বে।’

সম্প্রতি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে আবেদন করে অ্যাসোসিয়েশন অব স্কিন কেয়ার অ্যান্ড বিউটি প্রডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অব বাংলাদেশ। কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রিমার্ক এইচবি লিমিটেডকে সঙ্গে নিয়ে করা এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই এনবিআরকে মতামত প্রতিবেদন দেয় ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। কমিশন এতে স্থানীয়ভাবে কালার কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্য উৎপাদন, আমদানি, স্থানীয় চাহিদা, আমদানিতে বিদ্যমান শুল্কহার, স্থানীয় উৎপাদনের পরিমাণ, বিদ্যমান শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ও স্থানীয় বাজারমূল্য পর্যালোচনা করেছে।