দেশের বৃহৎ রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার রাত ১১টার দিকে ৫০-৬০ জন অস্ত্রধারী হঠাৎ হামলা করে গুরুত্বপূর্ণ এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে। এ সময় ৩০ রাউন্ড গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন আনসার সদস্যরা। আশাবুল গাজী (২০) নামে এক হামলাকারী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন খুলনা-৩ আনসার ব্যাটালিয়নের পরিচালক মোল্যা আবু সাইদ। অস্ত্রধারীদের হামলায় দুই আনসার সদস্যসহ পাঁচ নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন। হামলায় জড়িত সন্দেহে ১১ জনকে আটক করা হলেও কৌশলগত কারণে তাদের নাম-ঠিকানা জানায়নি পুলিশ।

আহত নিরাপত্তা কর্মীরা হলেন নিরাপত্তা সুপারভাইজার আকরাম (৫৫), সাইদুল ইসলাম (৩৭), জাহিদুল ইসলাম (৪০), ব্রজেন মণ্ডল (৩০) ও আনসার ব্যাটালিয়নের হাবিলদার কামাল পাশা (৩৮)। তাদের উদ্ধার করে প্রথমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিকিৎসা কেন্দ্রে নেয়া হয়। পরে রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তবে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় মিন্টু বৈরাগী ও আনসার সদস্য কামাল পাশাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ম্যাটেরিয়াল ইয়ার্ডটি মূল কেন্দ্রের বাইরে। কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা এ ইয়ার্ডে রড, তামার তার, তামার তারের বাক্স, লোহার অ্যাঙ্গেল, স্টিলের পাত, লোহার পাতসহ ব্যবহারযোগ্য ও ব্যবহার-অযোগ্য বিভিন্ন মূল্যবান ধাতু রাখা হয়। মূলত এসব ধাতু চুরি করতেই সংঘবদ্ধ চক্রটি ম্যাটেরিয়াল ইয়ার্ডে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকেই এ কেন্দ্রে ছোট ছোট চুরির ঘটনা ঘটছে।

এ ব্যাপারে রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা ও প্রশাসন) মো. অলিউল্লাহ বলেন, ‘তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মাঝে মাঝে চুরি হয়। কিন্তু কখনো একসঙ্গে এত বেশি দুষ্কৃতকারী আসেনি। এখানে শুধু মালামাল চুরি বা লুট নয়, অন্য কোনো বিষয় আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

আহত ব্রজেন মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাতে হঠাৎ করে ৫০-৬০ জন অস্ত্রধারী কাঁটাতারের বেড়া কেটে ম্যাটেরিয়াল ইয়ার্ডের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। আমরা বাধা দিলে দল বেঁধে হামলা করে তারা। এ সময় আমাদের আটকে রেখে মারধর করে। কাছে থাকা সেলফোনও ছিনিয়ে নেয় হামলাকারীরা। চিৎকার শুনে আনসার সদস্যরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও হামলা করে। একপর্যায়ে আনসার সদস্যরা গুলি ছুড়লে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।’

আহতদের প্রত্যেকের শরীরে জখম রয়েছে জানিয়ে রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা রুহুল আমিন সজিব বলেন, ‘রাত ১টার দিকে তাদের হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে দুজনের মাথায় গভীর ক্ষত থাকায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্যদের এখানে ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।’

আনসার সদস্যদের দাবি, নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর হামলা করলে হাবিলদার মো. কামাল পাশা ও সিপাহি মো. জাহিদুল ইসলাম অস্ত্রধারীদের ধাওয়া করেন। অস্ত্রধারীরাও আনসার সদস্যদের ওপর পাল্টা হামলা করে। একপর্যায়ে তারা কামাল পাশার মাথায় আঘাত করে। আত্মরক্ষায় কামাল পাশা অস্ত্রধারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। ৩০ রাউন্ড গুলি ছোড়ার পর অস্ত্রধারীরা পালিয়ে যায়। এ সময় আশাবুল গাজী নামে এক হামলাকারী গুলিবিদ্ধ হন।

খুলনা-৩ আনসার ব্যাটালিয়নের পরিচালক মোল্যা আবু সাইদ বলেন, ‘আহত আনসার সদস্যদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে এসএমজি পিস্তলের ২৬টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্যদের আরো সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঘটনার পর অভিযান চালিয়ে ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি কোনো ডাকাতির ঘটনা নয়। চক্রের সদস্যরা মূলত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিভিন্ন ম্যাটেরিয়াল চুরি করতে এসেছিল। ঘটনার পর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতের শনাক্ত করে গ্রেফতারের লক্ষ্যে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ মামলা করলে তা গ্রহণ করা হবে।’