যশোরে এক মাস ধরে চলছে তীব্র দাবদাহ। তাপমাত্রা বিরাজ করছে ৩৮ থেকে ৪১ ডিগ্রি পর্যন্ত। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন রেণুপোনা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতরা। কেননা প্রচণ্ড খরায় রেণুপোনা উৎপাদনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এতে এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হবে বলে জানান হ্যাচারি মালিকরা। এবার রেণুপোনা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দেড় লাখ কেজি। গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়েছে উৎপাদন। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও উৎপাদন হবে না বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত রেণুপোনা উৎপাদনের ভরা মৌসুম। দেশের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ রেণুপোনা যশোর থেকে সরবরাহ করা হয়। চাঁচড়া মৎস্যপল্লীর ৪২টি হ্যাচারিতে গত বছর প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কেজি রেণু উত্পন্ন হয়।

রেণুপোনা উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর করোনাভাইরাসের কারণে শ্রমিক সংকট, পোনার দাম কমে যাওয়া এবং বিদ্যুতের দাম বেড়ে যওয়ার কারণে হ্যাচারিগুলো বন্ধ করতে তারা বাধ্য হয়েছিলেন।

যশোর জেলা মৎস্য হ্যাচারি মালিক সমিতির সভাপতি ও ফাতিমা হ্যাচারির স্বত্বাধিকারী ফিরোজ খান জানান, যশোরে গত বছর আমরা দেড় লাখ কেজি রেণুপোনা উৎপাদন করেছিলাম। করোনায় অনেকে হ্যাচারি বন্ধ রেখেছিলেন। চলতি মৌসুমে পুরোদমে সবাই উৎপাদন শুরু করলেও প্রচণ্ড খরায় তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকে নেমে আসবে উৎপাদন। এতে হ্যাচারি মালিকদের ৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হবে। তিনি বলেন, আগে আমরা বিদ্যুৎ বিল দিতাম কৃষিতে। এখন সেখানে দিতে হচ্ছে শিল্পরেটে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, রেণুপোনা উৎপাদনে যশোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। জেলায় ৪২টি হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে কার্প জাতীয় রেণুপোনা উৎপাদন ৬৪ দশমিক ৮৬ টন। জেলায় রেণু পোনার চাহিদা ১৫ দশমিক ২৩ টন। উদ্বৃত্ত ৪৯ দশমিক ৬৩ টন দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। তেলাপিয়া পোনা ১০১ দশমিক ৪০ মিলিয়ন উৎপাদন হচ্ছে। জেলায় চাহিদা রয়েছে ৯৮ দশমিক ৮৫ টন। তেলাপিয়ার উদ্বৃত্ত ৬ দশমিক ৫৫ টন। পাঙ্গাশ রেণু উৎপাদন ৩ দশমিক ৬২ টন এবং শিং, মাগুর, পাবদা, গুলসা রেণু উৎপাদন শূন্য দশমিক ৮৫ টন।

যশোরে মোট ৫১টি বাঁওড় রয়েছে। যার আয়তন ১৮ হাজার ৮৪ হেক্টর। মূলত এসব বাঁওড় থেকে মাছ উৎপাদন হচ্ছে। এখানকার উৎপাদিত মাছ দেশের অর্ধেক চাহিদা মিটিয়ে থাকে।

যশোরের হ্যাচারিগুলো রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, বিগহেড, থাই সরপুঁটি, মিরর কার্প, জাপানি, চিতল, আইড়, তেলাপিয়া, মনোসেক্স তেলাপিয়া, শিং, কৈ, থাই কৈ, পাঙ্গাশ প্রভৃতি মাছের পোনা উৎপাদন করে থাকে। হ্যাচারির পাশাপাশি যশোরে পাঁচ-ছয় হাজার নার্সারি রয়েছে। জেলার দুই লাখ লোক মাছ উৎপাদন, চাষ এবং এ-সংশ্লিষ্ট পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

জেলা হ্যাচারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান গোলদার জানান, সব সময় আমাদের প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে রেণুপোনা উৎপাদন করতে হয়। প্রচণ্ড গরমে ব্যাহত হয় রেণুপোনা উৎপাদন। করোনার প্রভাবে ভরা মৌসুমে উৎপাদন করতে পারছি না। একই এলাকার মাছ চাষি অহিদুল্লাহ লুলু বলেন, করোনার প্রভাবের সঙ্গে তীব্র খরায় রেণুপোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

এ বিষয়ে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, করোনাভাইরাস ও প্রচণ্ড খরায় মৎস্য সেক্টরের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যার প্রভাব দেশের বাজারে পড়তে পারে।