যশোর সদর উপজেলার রামনগর পালপাড়া গ্রামের ৭৩ বছর বয়সী দেবেন্দ্রনাথ পাল। শৈশবে বাবাকে মাটির টালি তৈরির কাজে সহায়তা করতেন। একপর্যায়ে বাবার হাত ধরেই কুমার পেশায় জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। কিন্তু বর্তমানে মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় কমে গেছে উপার্জন। পরিবারের ব্যয়ভার বহন করা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দেবেন্দ্রনাথের।

রামনগর পালপাড়া গ্রামের ২০০টি পরিবার দেবেন্দ্রনাথের মতো কুমার পেশার সঙ্গে জড়িত। উপার্জন কমে যাওয়ায় এসব পরিবার দুর্দশায় জীবনযাপন করছে। তার ওপর করোনা মহামারীতে সৃষ্ট সংকট কুমার পেশায় জড়িতদের আরো দুরবস্থায় ফেলেছে।

মাটির শিল্পকর্ম ও তৈজসপত্র তৈরিই এসব পরিবারের জীবিকানির্বাহের একমাত্র উৎস। কিন্তু আধুনিক সময়ে প্লাস্টিক, সিরামিক, মেলামাইনের জনপ্রিয়তা বাড়ায় এ উৎস থেকে উপার্জন প্রায় আসছেই না। অন্যদিকে এ পেশায় বংশ পরম্পরায় ছেলেমেয়ে সবাই একসঙ্গে কাজ করেন। ফলে বেশির ভাগ মানুষ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। তাই তাদের অন্য পেশায় যাওয়ার সুযোগও হয় না। ফলে এ পেশায় জীবন চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন কুমাররা।

শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে রামনগর উপজেলার পালপাড়ায় ব্রিটিশ আমল থেকে মাটির তৈরি পণ্য উৎপাদন হয়ে আসছে। বংশ পরম্পরায় এখানকার বাসিন্দারা দিন-রাত পরিশ্রম করে বানাচ্ছেন মাটির টালি, মালসা, ব্যাংক, চাড়ি, ফুলের টপ। করোনায় প্রায় এক বছর সম্পূর্ণ বেকার থাকলে বর্তমানে পণ্যের অর্ডার আসতে শুরু করেছে। তবে সংখ্যায় তা খুবই নগণ্য। ফলে করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারছে না পালপাড়ার পরিবারগুলো।

দেবেন্দ্রনাথ পাল বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে মৃিশল্পের কাজে জড়িত। কিন্তু এক বছর ধরে এ পেশায় থেকে আর সংসার চলছে না। পাশাপাশি অন্য কাজও করতে হচ্ছে। এক সময় মাটির জিনিসপত্র তৈরির কাজে ১০ হাজার পরিবার জড়িত ছিল। কিন্তু টিকতে না পেরে এখন ২০০ পরিবার কোনো রকমে টিকে আছে।

সুশিল কুমার পাল বলেন, ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে মাটির চাড়ি, মালসা, ফুলের টপ তৈরি করে আসছি। এখানকার মৃিশল্প দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়। কিন্তু বর্তমানে সে অবস্থা নেই। ১০ বছর হলো সে ব্যবসা নেই। পরিবার নিয়ে টিকে থাকা কষ্টের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনিমাপাল নামে এক নারী মৃিশল্পী বলেন, মাটির চাড়া প্রস্তুত করতে এক সপ্তাহ সময় লাগে। টালি তৈরির উপকরণ হিসেবে প্রতি ট্রাক মাটি কিনতে হয় ১ হাজার ২০০ টাকায়। কোনো রকমে বেঁচে আছি আমরা। অভাবের কারণে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পায় না। মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিতে হয়। কেউ আমাদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করে না।

রামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজনিন নাহার বলেন, বরাদ্দ এলেই আমরা সবাইকে সমানভাবে খাদ্যসহায়তা দিয়ে থাকি। পালপাড়ায়ও দিয়েছি। তাদের জীবনমান উন্নয়নে উদ্যোগ নেয়া হবে।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বিপুল জানান, সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দ আমরা সব ইউনিয়নে দিয়ে থাকি। তর পরও কীভাবে মৃিশল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যায় এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে।