মহামারী নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর গত মার্চে লকডাউন ঘোষণা করে সরকার। এরপর কৃষিপণ্য পরিবহন, বাজারজাতসহ নানা জটিলতায় পড়েন প্রান্তিক কৃষকরা। এ সংকট থেকে উত্তরণে তিন পার্বত্য জেলায় তিন ধাপে ২৫ হাজারের অধিক কৃষককে প্রণোদনার আওতায় এনেছে কৃষি বিভাগ। কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে পারিবারিক পুষ্টিবাগান স্থাপনে ৩ হাজার ১৯০, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বীজ সহায়তা বাবদ ১৫ হাজার ও বিভিন্ন প্রজাতির সবজিবীজসহ ধানবীজ ও সারসহায়তা বাবদ সাত হাজার কৃষককে তিন ধাপে এ প্রণোদনা দেয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার প্রভাবে পাহাড়ি অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও পরিবহন সংকটসহ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে লোকসানে পড়েন পাহাড়ের প্রান্তিক কৃষকরা। এ সংকট উত্তরণে প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছে কৃষি বিভাগ। তিন ধাপে এ প্রণোদনার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনে আরো বেশি সফলতা আসবে বলে মনে করছেন তারা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙ্গামাটি অঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের নভেম্বরে রাঙ্গামাটির ১০ উপজেলায় প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় এক হাজার কৃষককে বোরো হাইব্রিড ধানবীজ, ১০০ কৃষককে গমবীজ, ৫০০ কৃষককে ভুট্টাবীজ, ২০০ কৃষককে সরিষাবীজ, ১০০ কৃষককে চীনাবাদামের বীজ, ১০০ কৃষককে শীতমুগের বীজ এবং ১০০ কৃষককে পেঁয়াজের বীজ সরবরাহ করা হয়। এছাড়া খাগড়াছড়ির আট উপজেলায় এক হাজার কৃষককে বোরো হাইব্রিড ধানবীজ, ১০০ কৃষককে গমবীজ, ৫০০ কৃষককে ভুট্টাবীজ, ২০০ কৃষককে সরিষাবীজ, ১০০ কৃষককে চীনাবাদামের বীজ ও ১০০ কৃষককে শীতমুগের বীজ দেয়া হয়েছে। বান্দরবানের নয় উপজেলায় এক হাজার কৃষককে বোরো হাইব্রিড ধানবীজ, ১০০ কৃষককে গমবীজ, ৫০০ কৃষককে ভুট্টাবীজ, ২০০ কৃষককে সরিষাবীজ, এক হাজার কৃষককে চীনাবাদামের বীজ এবং ১০০ কৃষককে শীতমুগের বীজ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এক বিঘা পরিমাণ জমিতে চাষাবাদের জন্য ইউরিয়া, টিএসপি ও এমপিও সার দেয়া হয়েছে।
সূত্রটি জানায়, নভেম্বরেই প্রতিটি পার্বত্য জেলায় প্রণোদনা হিসেবে বীজসহায়তা কর্মসূচির আওতায় পাঁচ হাজার করে মোট ১৫ হাজার কৃষককে বোরো হাইব্রিড বীজ দেয়া হয়েছে। এতে দুই ধাপে মোট ১৮ হাজার কৃষককে এক কেজি করে বোরো হাইব্রিড বীজসহায়তা দেয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এক কেজি বোরো হাইব্রিড ধানবীজ দিয়ে এক বিঘা জমি চাষাবাদ করা যায়। সে হিসেবে ১৮ হাজার বিঘা চাষাবাদের জন্য বোরো হাইব্রিড ধানবীজ সহায়তা দেয়া হয়েছে।
এদিকে ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাইয়ে পারিবারিক কৃষির আওতায় বসতবাড়িতে এক শতক জায়গায় সবজির পুষ্টিবাগান স্থাপনে তিন পার্বত্য জেলার ৩ হাজার ১৯০ জন প্রান্তিক কৃষককে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। প্রণোদনা বাবদ রাঙ্গামাটির ১ হাজার ৪৩০, খাগড়াছড়ির ৯৬০ ও বান্দরবানের ৮০০ কৃষক উপকারভোগী হয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে বিনা মূল্যে বীজ ও চারাসহায়তা পান। জনপ্রতি জৈব ও অজৈব সার বাবদ ৪৩৫ টাকা, শাকসবজির ক্ষেতে বেড়া তৈরির খরচ বাবদ ১ হাজার ও পরিচর্যা বাবদ ৫০০ টাকাসহ নগদ মোট ১ হাজার ৯৩৫ টাকা পেয়েছেন তারা। সে হিসেবে পার্বত্য তিন জেলার ৩ হাজার ১৯০ জন প্রান্তিক কৃষক প্রণোদনা প্যাকেজের ৬১ লাখ ৭২ হাজার ৬৫০ টাকা পেয়েছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙ্গামাটি অঞ্চল কার্যালয়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের প্রভাবে সারা দেশেই প্রান্তিক কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। সঠিক সময়ে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও বিক্রি করতে না পারায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রান্তিক কৃষকদেরও সরকার তিন ধাপে পারিবারিক পুষ্টিবাগান স্থাপন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বোরো বীজ এবং বিভিন্ন প্রজাতির সবজিবীজসহ সারসহায়তা বাবদ প্রণোদনা দিয়েছে। এরই মধ্যে তিন দফার প্রণোদনা প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগ মনে করে, বৃহত্ভাবে না হলেও এ প্রণোদনা কৃষির উৎপাদন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙ্গামাটি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ পবন কুমার চাকমা বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষিপণ্যের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সাধারণ ছুটি চলাকালেও কৃষি বিভাগ কৃষকদের নানাভাবে সহায়তা করেছে। সরকার করোনার উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিন পার্বত্য জেলার কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় তিন ধাপে সহায়তা দিয়েছে, যা এরই মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।










