টেক্সটাইল ও চামড়া শিল্প এলাকায় পানিতে বিপজ্জনক রাসায়নিক পিফাসের মাত্রা বাড়ছে। এতে শিল্পাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। আজ শনিবার (৩ মে) রাজধানীর গুলশানে ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে পিএফএএস দূষণ ও জনস্বাস্থ্য’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব তথ্য জানান।
সেমিনারে জানানো হয়, দেশের টেক্সটাইল কারখানাগুলোর আশপাশের ৭৫ শতাংশ কলের পানিতে ও ৮৭ শতাংশ পৃষ্ঠজলে পিফাস পাওয়া গেছে। এছাড়া সাভারের কর্ণতলী নদীতে ডাচ পরামর্শক সংস্থার প্রস্তাবিত সীমার চেয়ে ৫৪ হাজার গুণ বেশি পিফাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্যান্সার, লিভারের ক্ষতি ও থাইরয়েডের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
সেমিনারের মূল প্রবন্ধে বলা হয়, পিফাস (পার- ও পলিফ্লুরোঅ্যালকাইল সাবস্ট্যান্সেস) মূলত ব্যবহৃত হয় নন-স্টিক কুকওয়্যার, খাবারের মোড়ক, অগ্নিনির্বাপক ফোম ও কাপড়ে। এসব রাসায়নিক শিল্পবর্জ্যের মাধ্যমে মাটি ও পানিতে মিশে যায়। বাংলাদেশে এখনো পিফাস নিষিদ্ধে কোনো জাতীয় নীতিমালা নেই।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ বলেন, পিফাস দূষণে আমরা ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে আছি। আর্সেনিক দূষণের মতোই পিফাসও ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, পানি রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু নীতিমালার দুর্বলতা ও দূরদৃষ্টির অভাবে আমরা এখন প্রতিদিন দূষিত পানি পান করছি। পরিবেশ রক্ষায় সরকারকে এখনই নদী ও শিল্পবর্জ্য নিয়ে ভাবতে হবে। টাস্কফোর্স গঠন করে একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
সেমিনারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিউবার্ট বোম বলেন, দ্রুত শিল্পায়নের ফলে পিফাস দূষণ বেড়েছে। এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, বৈশ্বিক সমস্যা। তাই প্রতিটি দেশকে এ বিষয়ের গুরুত্ব বুঝতে হবে। কেমিক্যাল আমদানির ক্ষেত্রে নিবন্ধন ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে টেক্সটাইল ও প্রসাধনী খাতকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন বলেন, শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা জরুরি। তিনি বলেন, যারা দূষণ করছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সবুজ শিল্পায়নের জন্য পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে। তিনি জানান, বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচিতে পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, আমাদের দেশে জনস্বাস্থ্যকে কেবল চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এটা এখন বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, শিল্পকারখানা স্থাপনের আগে পরিবেশ, শ্রমিক ও জনস্বাস্থ্য—এ তিনটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। দেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা মাথায় রেখে এখনই পরিকল্পনা করতে না পারলে ভয়াবহ বিপর্যয় আসবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার। সঞ্চালকের দায়িত্বে ছিলেন ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল।
সেমিনারে বাংলাদেশে পিফাস দূষণ নিয়ে অবস্থানপত্র উপস্থাপন করেন সিনিয়র ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্টিভিস্ট শাহিদ হাসান। আলোচনায় অংশ নেন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) এর সহ-আহ্বায়ক এমএস সিদ্দিকী, ওয়াটারকিপার অ্যালায়েন্সের অ্যাডভোকেসি পরিচালক জ্যাকি এসপোসিটো, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা সাইপ্রেস সিস্টেম আইএনসির চিফ টেকনোলজি অফিসার ড. জাকি ইউসুফ, ইএসডিওর প্রোগ্রাম উপদেষ্টা অটল কুমার মজুমদার এবং থ্রি ফিফটি ডট অর্গের দক্ষিণ এশিয়া মোবিলাইজেশন সমন্বয়ক আমানুল্লাহ পরাগ।
বক্তারা বলেন, পিফাস দূষণ এখন আর অবহেলার বিষয় নয়। এ সমস্যাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় এনে দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও মত দেন তারা।










