পরপর দুই দিনে বড় দলের কাছে ধরাশায়ী হয় বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস। ২৪ অক্টোবর মুম্বাইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১৪৯ রানে হেরে যায় সাকিবের দল। পরদিন দিল্লিতে ডাচদের ৩০৯ রানের রেকর্ড ব্যবধানে বিধ্বস্ত করে অজিরা। ওই ভরাডুবির পর ডাচরা ফিরলেও পারল না টাইগাররা। ইডেন গার্ডেনসে গতকাল দুই ‘ছোট’ দলের লড়াইয়ে নেদারল্যান্ডসের কাছে ৮৭ রানে হেরে গেছে বাংলাদেশ। ২৩০ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ৪২.২ ওভারে ১৪২ রানে গুটিয়ে গেছে সাকিব আল হাসানের দল। লজ্জাজনক এ হারে সেমিফাইনালে খেলার স্বপ্নও শেষ হলো।
২৩০ রানের সাদামাটা টার্গেট তাড়া করতে নেমে ১৯ রানের মধ্যে দুই ওপেনার লিটন দাস ও তানজিদ হাসানকে হারায় বাংলাদেশ। লিটনকে ফেরান আরিয়ান দত্ত, আর লোগান ফন বিকের শিকার তানজিদ। এরপর নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট হারাতে থাকে বাংলাদেশ। নাজমুল হোসেন শান্ত, সাকিব আল হাসান, মেহেদী মিরাজ ও মুশফিক বিদায় নিলে দলের স্কোর দাঁড়ায় ৭০/৬। পেস বোলার পল ফন মিকিরেন তিন উইকেট শিকার করে বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন। তিনি পরে নেন আরো একটি উইকেট।
আগের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করা মাহমুদউল্লাহ টিকে ছিলেন বলে হয়তো আশায় ছিলেন সমর্থকরা। কিন্তু প্রতিদিন তো আর রোববার হয় না! কাল তিনি কিছুক্ষণ লড়লেন বটে, তবে তা দলের হারের ব্যবধানই যা একটু কমিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ৪১ বলে ২০ রান করে ফিরেছেন সাজঘরে। শেখ মেহেদী হাসানের সঙ্গে তার গড়া ৩৮ রানে জুটিটাই গতকাল বাংলাদেশ ইনিংসে সবচেয়ে ‘সেরা’।
এরপর মুস্তাফিজ (২০) ও তাসকিন (১১) খানিকটা লড়াই করলেও ৪২.২ ওভারে ১৪২ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ।
ডাচ অধিনায়ক স্কট এডওয়ার্ডস পারলেও পারেননি বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব। ১৭ অক্টোবর ধর্মশালায় দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৪০ রানে ৭ উইকেট হারানোর পর এডওয়ার্ডসের লড়াকু ইনিংসে (৬৯ বলে ৭৮*) ভর করে শেষ পর্যন্ত ৮ উইকেটে ২৪৫ রানের পুঁজি পায় ডাচরা। পরের গল্পটা তো এরই মধ্যে সবার জানা হয়ে গেছে। ম্যাচে প্রোটিয়াদের ২০৭ রানে অলআউট করে ৩৮ রানের স্মরণীয় জয় পায় ইউরোপের দলটি।
গতকাল আবারো জয়ের নায়ক এডওয়ার্ডস। অস্ট্রেলিয়ান বংশোদ্ভূত এ উইকেটকিপার-ব্যাটার গতকাল দলের বিপর্যয়ে আবার হাল ধরেন। আরেকবার চওড়া হলো তার ব্যাট। ৮৯ বলে ৬৮ রান করেছেন তিনি। তার ইনিংসটা খুব বড় না হলেও প্রভাব অনেক বড়।
পঞ্চম উইকেটে বাস ডি লিডিকে নিয়ে ৪৪ ও ষষ্ঠ উইকেটে সাইব্র্যান্ড এঙ্গেলব্র্যাখটকে নিয়ে ৭৮ রানের জুটি গড়ে তিনি বিপর্যয় সামাল দেন। দলের রান ১৮৫-তে নেয়ার পর মুস্তাফিজের বলে মিরাজকে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফেরেন এডওয়ার্ডস। ততক্ষণে লড়াই করার মতো ভিত পেয়ে গেছে ডাচরা। পরে ফন বিক (১৬ বলে ২৩*) টেল-এন্ডের অন্যদের নিয়ে দলের রান ২২৯ পর্যন্ত টেনে নেন। বাস ডি লিডি ১৭ ও এঙ্গেলব্র্যাখট ৩৫ রান করেন।
আরো আগেই ডাচদের অলআউট করে দিতে পারত বাংলাদেশ। পারেনি নিজেদেরই ভুলে। দলের স্কোর ৬৩/৪ থাকার সময় দুই-দুইবার জীবন পান এডওয়ার্ডস। ১৫.২ ওভারে মুস্তাফিজের বলে স্লিপে ক্যাচ দেন ডাচ অধিনায়ক, যদিও তা হাত থেকে ফেলে দেন লিটন দাস। ওই ওভারের চতুর্থ বলে আবার উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন তিনি। এবার তা তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হলেন অভিজ্ঞ উইকেটকিপার মুশফিকুর রহিম। এভাবে তিন বলের মধ্যে দুবার জীবন পেয়ে শেষ পর্যন্ত ফিফটি আদায় করে ম্যাচের ভাগ্যটাই লিখে দিলেন এডওয়ার্ডস।
বাংলাদেশের বোলাররা তাদের দায়িত্বটা সঠিকভাবেই পালন করেন। চোট কাটিয়ে দলে ফেরা তাসকিন আহমেদ (২/৪৩) ও শরিফুল ইসলামের (২/৫১) পর মুস্তাফিজ (২/৩৬) চাপে রাখেন প্রতিপক্ষকে। শেষ দিকে স্পিনার শেখ মেহেদী হাসান দুই উইকেট নিয়ে অবদান রাখেন। আর অধিনায়ক সাকিব ৩৭ রানে নেন একটি উইকেট।
টস জিতে ব্যাটিং নিয়ে শুরুতেই বিপদে পড়ে ডাচরা। প্রথম ওভারেই ওপেনার বিক্রমজিৎ সিংকে সাজঘরে ফেরান তাসকিন। মিড-অফে সাকিবকে ক্যাচ দেন তিনি। পরের ওভারে শরিফুলের বলে তানজিদ হাসানকে ক্যাচ দেন ম্যাক্স ও’ডাউড। এ সময় ডাচদের স্কোর রূপ নেয় ৪/২-এ। এরপর দলকে টানেন ৩৯ বছর বয়সী ওয়েসলি বারেসি ও কলিন অ্যাকারম্যান। যদিও ১৪ ও ১৫তম ওভারে পরপর এ দুজনের বিদায় ঘটে। এরপর এডওয়ার্ডস বীরত্বে ক্রমে ডাচদের আশা বাড়ে, আর হতাশা বাড়ে সাকিবদের। শেষ পর্যন্ত সেই এডওয়ার্ডসের ব্যাটই গড়ে দিল ব্যবধান।
গতকালের এ জয়ে টেবিলের তলানি থেকে এক লাফে আট নম্বরে উঠে গেল ডাচরা। আর বাংলাদেশ নেমে গেল নয় নম্বরে। টেবিলের একেবারে তলানিতে ইংল্যান্ড।
কানাডা, কেনিয়া, আয়ারল্যান্ডের পর আইসিসির সহযোগী আরেকটি দেশের কাছে বিশ্বকাপে হারল বাংলাদেশ। হার শেষে বাংলাদেশ দলনায়ক সাকিব বলেন, ‘আমরা ভালো বোলিং করলেও ফিল্ডিং বাজে হয়েছে। আমরা তাদের ১৬০-১৭০ রানেই আটকে দিতে পারতাম। টুর্নামেন্টজুড়েই আমরা ভালো ব্যাটিং করিনি, এটিও ছিল জঘন্যতম। সামনে কাজটা কঠিন, তবু আমরা চেষ্টা করব যে মাথা উঁচু করে বিদায় নিতে পারি।’
সংক্ষিপ্ত স্কোর
নেদারল্যান্ডস: ৫০ ওভারে ২২৯ (এডওয়ার্ডস ৬৮, বারেসি ৪১, এঙ্গেলব্র্যাখট ৩৫; মুস্তাফিজ ২/৩৬)। বাংলাদেশ: ৪২.২ ওভারে ১৪২ (মিরাজ ৩৫, মাহমুদউল্লাহ ২০; মিকিরেন ৪/২৩, ডি লিডি ২/২৫)। ফল: নেদারল্যান্ডস ৮৭ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: পল ফন মিকিরেন (নেদারল্যান্ডস)।










