কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলায় গত সেপ্টেম্বরে ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে চলতি বছরের মে মাসে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে আট বছর বয়সী এক শিশুকে হত্যার ঘটনায় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। আর ২০১৯ সালে সুনামগঞ্জে পাঁচ বছর বয়সী তুহিন মিয়া হত্যা মামলায় তার ১৭ বছর বয়সী চাচাতো ভাইকে আট বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। শুধু এ ঘটনাগুলোই নয়; পুলিশের মামলা পর্যালোচনার তথ্য বলছে, বিভিন্ন অপরাধে গ্রেফতার হওয়া প্রায় প্রতি তিন শিশুর একজন হত্যা মামলার আসামি। কখনো বন্ধু, কখনো স্থানীয় বড় ভাইদের সঙ্গে মিশে সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে শিশুরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের শিশুদের শুধু শাস্তির আওতায় আনলেই হবে না; তাদের সংশোধন ও পুনর্বাসনে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগের ১৬০টি থানার মামলা পর্যালোচনা করে একটি গবেষণা প্রকাশ করেছে পুলিশ স্টাফ কলেজ (পিএসসি)। ‘সোশিওইকোনমিক ডিটারমিন্যান্টস অব চিলড্রেন ইন কনফ্লিক্ট উইথ দ্য ল ইন বাংলাদেশ: আ ক্রিমিনোলজিক্যাল অ্যানালাইসিস’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে পিএসসি জার্নালের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যায়। গবেষণাটি করেছেন পিএসসির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ও রামন চন্দ্র তালুকদার। গবেষণায় পরিমাণগত ও গুণগত দুই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। দেশের আট বিভাগের ১৬০টি পুলিশ স্টেশন থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি তিনটি সরকারি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (গাজীপুর বালক, গাজীপুর বালিকা ও যশোর বালক) থেকে ৪০৪ শিশু ও তাদের ১৫৬ অভিভাবকের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, অপরাধে জড়ানো প্রায় প্রতি তিন শিশুর একজনের বিরুদ্ধেই হত্যার অভিযোগ রয়েছে। এ হার ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ। অপরাধ সংঘটনের সময় ৫২ দশমিক ৯৭ শতাংশ শিশু অন্য কারো সঙ্গে ছিল। তাদের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৯২ শতাংশের সঙ্গী ছিল বন্ধু। এসব বন্ধুত্বের গড় মেয়াদ ছিল আট বছর। ফলে কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তিগত আচরণ নয়, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অপরাধে সম্পৃক্ত শিশুদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ ধর্ষণ, ধর্ষণে সহায়তা বা প্ররোচনার মামলার আসামি। এছাড়া ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশের বিরুদ্ধে চুরি, ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবহার, ১০ দশমিক ৪৫ শতাংশের বিরুদ্ধে অপহরণ এবং ৯ দশমিক ৬১ শতাংশের বিরুদ্ধে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। অন্যান্য অপরাধের মামলা রয়েছে ৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ শিশুর বিরুদ্ধে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশু-কিশোরদের অপরাধে সম্পৃক্ততা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। তারা যদি হত্যা ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে সমাজে সংঘবদ্ধ অপরাধের বিস্তার আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনের সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি কাউন্সেলিং, পারিবারিক তত্ত্বাবধান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের সংশোধন ও পুনর্বাসনে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া না হলে ভবিষ্যতে এর সামাজিক মূল্য আরো ভয়াবহ হতে পারে।’
কিশোর অপরাধের পেছনে বন্ধুমহলের প্রভাবের বিষয়টিও গবেষণায় জোরালোভাবে উঠে এসেছে। অপরাধ সংঘটনের সময় ৫২ দশমিক ৯৭ শতাংশ শিশু অন্য কারো সঙ্গে ছিল এবং তাদের ৮৬ দশমিক ৯২ শতাংশের সঙ্গী ছিল বন্ধু। এসব বন্ধুত্বও ছিল দীর্ঘদিনের; অপরাধের সময় সঙ্গে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কের গড় মেয়াদ ছিল আট বছর। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধে সহযোগী বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কটি সাময়িক বা ঘটনাকেন্দ্রিক নয়।
গবেষণায় বন্ধুমহলের চাপ, কিশোর গ্যাংয়ে সম্পৃক্ততা, মাদকের সংস্পর্শ ও অভিভাবকের দুর্বল নজরদারিকে শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সমবয়সীদের চাপ ও অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি তাৎক্ষণিক কারণ হলেও এর পেছনে দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতিও কাজ করে।
শিশু সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন করে কাজ করছেন বিজন চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গঠনের ভিত্তি। কিন্তু মানসম্মত বুনিয়াদি শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অনেক শিশু ঝুঁকির মধ্যে বেড়ে উঠছে। বিশেষ করে পথশিশু ও হতদরিদ্র পরিবারের শিশুরা জীবিকার তাগিদে অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্রের একটি অংশ তাদের মাদকে আসক্ত করছে এবং মাদকের চাহিদাকে পুঁজি করে বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্রকে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, মাদকাসক্ত শিশুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে, যাতে জীবিকার তাগিদে তাদের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়তে না হয়। পাশাপাশি কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। শিশুদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, তাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।’
পুলিশের গবেষণায় শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়াকে শুধু ব্যক্তিগত নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়নি। বরং আর্থসামাজিক বৈষম্য, পরিবার, শিক্ষা, বন্ধুমহল ও স্থানীয় সামাজিক পরিবেশের সম্মিলিত প্রভাবকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, অপরাধে জড়ানো শিশুদের বড় একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার থেকে এসেছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের ৪৪ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশের পরিবারে আয় ছিল ব্যয়ের তুলনায় কম। এসব পরিবারকে আর্থিক ঘাটতিতে থাকা পরিবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিবারগুলোর গড় মাসিক আয় ছিল ১৯ হাজার ২৭৫ টাকা। তবে আয়ের পরিমাণ ২ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছিল।
গবেষণায় আরো দেখা যায়, ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুর পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি মামলা ছিল। এসব পরিবারের অভিযুক্ত সদস্যদের মধ্যে বাবার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের মধ্যে হত্যার অভিযোগও উল্লেখযোগ্য; এ হার ৩৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী কেউ অপরাধে জড়ালে তাকে সাধারণ আসামির মতো থানায় বা কারাগারে রাখা যায় না; তার বিচার হতে হবে বিশেষায়িত শিশু আদালতে। গুরুতর অপরাধেও শিশু আসামিকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দেয়া যায় না; বরং শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রেখে সংশোধনের ব্যবস্থা রয়েছে। আইনের মূল লক্ষ্য শাস্তি নয়, সংশোধন ও পুনর্বাসন।
শিশুরা হত্যা মামলার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে তাদের বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা বিবেচনায় নেয়া জরুরি বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের মতো পদ্ধতিতে শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বলপ্রয়োগ বা ভীতিকর পরিবেশের মধ্য দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে শিশুমনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা তাকে সংশোধনের পরিবর্তে আরো অপরাধপ্রবণ করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করে। শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে সামাজিক অস্থিরতা, পারিবারিক আর্থিক সংকট এবং অপরাধীদের প্রতি সমাজের বাহবা দেয়ার অপসংস্কৃতি শিশুদের অপরাধে আকৃষ্ট করতে পারে। আবার শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে অন্য শিশুদের সঙ্গে অপরাধের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়েও নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই শিশুদের শুধু শাস্তির আওতায় আনলেই হবে না; তাদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পড়াশোনায় ফেরানো, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা, অনুকরণীয় ব্যক্তিদের জীবন সম্পর্কে ধারণা দেয়া এবং অপরাধের পরিণতি বোঝানোর মতো উদ্যোগ প্রয়োজন।’
গবেষণায় শিশুদের ঘরের বাইরে কাটানো সময়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শিশু দীর্ঘ সময় ঘরের বাইরে কাটায়; তাদের বাইরে থাকার গড় সময় প্রায় ৮ ঘণ্টা। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাইরে থাকা, শিক্ষার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা, বন্ধুমহলের প্রভাব ও পারিবারিক তদারকির ঘাটতি শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, স্কুল, পরিবার ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়লে শিশুদের কাছে বিকল্প সামাজিক নেটওয়ার্ক, বিশেষ করে বন্ধুমহল বা গ্যাংয়ের প্রভাব বাড়তে পারে। তাই কিশোর অপরাধ মোকাবেলায় শুধু গ্রেফতার ও মামলা যথেষ্ট নয়; শিশুদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলোও মোকাবেলা করতে হবে।
শিশুদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ নিয়েও উদ্বেগের তথ্য উঠে এসেছে গবেষণায়। এতে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিশু অভিযোগ করেছে, পুলিশ তাদের কাছে টাকা দাবি করেছে এবং মানসিক নির্যাতন করেছে। তবে ৪৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, পুলিশ তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেছে। গবেষকদের মতে, গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদের সময় বলপ্রয়োগ, শারীরিক নির্যাতন কিংবা প্রক্রিয়াগত অনিয়ম শিশুদের মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করতে পারে। এতে তাদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) কামরুন মুনিরা। তিনি দেশের বাইরে থাকায় সরাসরি তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখা বণিক বার্তাকে জানায়, দেশের প্রতিটি থানায় শিশুদের জন্য বিশেষ ডেস্ক রয়েছে। কোনো শিশুর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ আইন ও বিধি অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেয়া হয়। শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শিশু অপরাধ দমন করা দুরূহ। অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের সংশোধনের ব্যবস্থাও করতে হবে। তারা যেন পুনরায় অপরাধে না জড়ায়, সেজন্য রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করে শিশুর যথাযথ বিকাশের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।










