ভারতে ত্রয়োদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ত্রয়োদশ ম্যাচে এসে ঘটল বড় অঘটন। গতকাল দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে ৬৯ রানে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল আফগানিস্তান। ২৮৫ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নামা ইংলিশদের ২১৫ রানে অলআউট করে ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় হাশমতউল্লাহ শহিদির দল। বিশ্বকাপে তো বটেই, যেকোনো ফরম্যাটের ক্রিকেটে এই প্রথম ইংলিশদের হারানোর কৃতিত্ব দেখাল তারা। চলতি বিশ্বকাপে প্রথম ও ওয়ানডে বিশ্বকাপে এটি আফগানিস্তানের দ্বিতীয় জয়। 

অথচ এ ম্যাচ শুরুর আগে বেশির ভাগ ক্রিকেট সমর্থকই হয়তো আরেকটি একপেশে ম্যাচের কথাই ভেবেছিল। ভাবারই কথা। এর আগে ওয়ানডে ও টি২০ মিলে কখনো ইংল্যান্ডকে হারাতে পারেনি আফগানরা। ওয়ানডে বিশ্বকাপেও তাদের ইতিহাস ছিল বিষাদময়। চলতি বিশ্বকাপসহ মোট তিন আসরে অংশ নিয়ে গতকালের আগ পর্যন্ত মোট ১৭ ম্যাচের মধ্যে ১৬টিতেই হেরেছে এশিয়ান দলটি। এমন লজ্জার রেকর্ডধারীরা কিনা গতকাল বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের মাটিতে নামাল। 

টস জিতে বোলিং বেছে নেয় ইংল্যান্ড। যদিও জস বাটলারের পরিকল্পনা বিফল করে দেন আফগানরা। মাত্র ৭৭ বলে ১০০ ছোঁয়া দলটি শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে অলআউট হয়েছে। জবাব দিতে নেমে আফগান স্পিন বিষে নীল হয়েছে ইংলিশ ব্যাটিং লাইনআপ। বিশ্বব্যাপী ঘরোয়া টি২০ লিগ দাপিয়ে বেড়ানো মুজিব-উর-রহমান (৩/৫১), মোহাম্মদ নবি (২/১৬) ও রশিদ খানের (৩/৩৭) স্পিনের কোনো জবাব যেন জানা ছিল না চ্যাম্পিয়নদের। এছাড়া পেসম্যান ফজলহক ফারুকি ও নবীন-উল-হকের শিকার হয়েছেন যথাক্রমে জনি বেয়ারস্টো ও জন বাটলারের মতো দলের দুই সেরা ব্যাটার। ইংল্যান্ড ইনিংসে একমাত্র ফিফটি করা হ্যারি ব্রুক ৬১ বলে ৬৬ রান করেন সাত বাউন্ডারি ও এক ছক্কায়। কিন্তু তিনি দলের হার এড়াতে পারেননি। 

এর আগে রহমানুল্লাহ গুরবাজ উদ্বোধন করতে নেমে ব্যাটে ঝড় বইয়ে দেন। তিনি ৩৩ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন। তার ব্যাটে ভর করেই আফগানরা ৭৭ বলে শতরান পূর্ণ করে। দলীয় ১১৪ রানের সময় ইব্রাহিম জাদরান ৪৮ বলে ২৮ রান করে আদিল রশিদের শিকার হন। তিনে নামা রহমত শাহও শিকার হন আদিল রশিদের। ১৯তম ওভারে তাকে স্টাম্পিং করেন বাটলার। ওই একই ওভারে রানআউটের খড়্গে কাটা পড়েন দুর্দান্ত খেলতে থাকা গুরবাজ।

সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত ৫৭ বলে ৮ চার ও ৪ ছক্কায় ৮০ রান করে সাজঘরের পথ ধরেন গুরবাজ। তার আউটের মধ্য দিয়ে আফগানদের রানের গতিও কমে যায়। ভারতের বিপক্ষে ফিফটি করা দুই ব্যাটার হাশমতউল্লাহ শহিদি ও আজমতউল্লাহ ওমরজাই আশা দেখিয়েও ইনিংস বড় করতে পারেননি। শহিদি ১৪ ও ওমরজাই ১৯ রান করেন। 

মিডল অর্ডারে নামা ইকরাম আলিখিল টেল-এন্ডের সাহায্য নিয়ে দলের সংগ্রহটা পৌনে তিনশ ছাড়ান। তিনি ৬৬ বলে ৩টি চার ও ২টি ছক্কায় ৫৮ রান করে রিস টপলির শিকার হন। এরপর মুজিব-উর-রহমান (১৬ বলে ২৮) ও রশিদ খান (২২ বলে ২৩) আফগানদের সংগ্রহটা বড় করেন। ইংলিশ বোলারদের মধ্যে আদিল রশিদ ৪২ রানে ৩টি, মার্ক উড ৫০ রানে ২টি উইকেট নেন। 

একটি পর্যায়ে অবলীলায় ৩০০ রান ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। যদিও গুরবাজের আউটের মধ্য দিয়ে রানের লাগাম টেনে ধরে ইংলিশরা। শেষ রক্ষা অবশ্য হলো না বাটলারদের। এ রানকে পুঁজি করেই দলকে বড় জয় এনে দিলেন মুজিব-রশিদ-নবিরা।

বাংলাদেশের কাছে ধর্মশালায় ৬ উইকেটে হারের পর দিল্লিতে গত বুধবার স্বাগতিক ভারতের কাছে ৮ উইকেটে বিধ্বস্ত হয় আফগানিস্তান। ভারতের মাটিতে তৃতীয় ম্যাচে এসে হাসি ফুটবল আফগানদের মুখে।  

এর আগে ওয়ানডে বিশ্বকাপে দুবারের দেখায় প্রতিবারই ইংলিশদের কাছে খড়কুটোর মতো উড়ে যায় আফগানরা। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলা আফগানিস্তানকে ডিএলএস মেথডে ৯ উইকেটে হারায় ইংলিশরা। ২০১৯ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পথে আফগানদের ১৫০ রানের বিশাল ব্যবধানে হারায় ইংলিশরা। টি২০তে তিনবারের দেখায় কখনো জেতা হয়নি আফগানদের। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ইংল্যান্ড ৫-০তে এগিয়ে থেকে গতকাল দিল্লিতে মাঠে নামে। এবার হারের বৃত্ত ভাঙল আফগানরা। 

এর আগে ওয়ানডে বিশ্বমঞ্চে ১৭ ম্যাচ খেলে মাত্র একটিতে জিতেছে আফগানিস্তান। ২০১৫ সালে অভিষেক আসরে ৬ ম্যাচ খেলে আসে একটি জয় (স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে)। ২০১৯ সালের আসরে প্রথম দল হিসেবে টানা ৯টি ম্যাচ হেরে যায় আফগানিস্তান। এবারো টানা দুই হারে বিপর্যস্ত হয় দলটি। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দলটি সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে এবার জেগে উঠল। 

জয় শেষে ম্যাচসেরা মুজিব-উর-রহমান বলেন, ‘বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে দেয়ার এমন মুহূর্ত সত্যিই বড় গৌরবের। গোটা দলের জন্যই এটা বড় এক অর্জন এবং আমরা এই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। বোলার ও ব্যাটারদের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স।’

গতকালের এ জয়ে পয়েন্টের খাতা খুলল আফগানিস্তান। দুই দলেরই তিন ম্যাচ শেষে এখন সমান দুই পয়েন্ট। সেমিফাইনালের আশা শেষ হয়ে যায়নি কারোরই, তবে পথটা কঠিন। আগামী শনিবার মুম্বাইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে ইংলিশরা। বুধবার চেন্নাইয়ে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আফগানরা। 

পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া এ মুহূর্তে পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে। আজ লক্ষ্ণৌতে শ্রীলংকার মুখোমুখি হবে অজিরা। 

সংক্ষিপ্ত স্কোর

আফগানিস্তান: ৪৯.৫ ওভারে ২৮৪/১০ (গুরবাজ ৮০, আলিখিল ৫৮, জাদরান ২৮, মুজিব ২৮, রশিদ ২৩; আদিল ৩/৪২, মার্ক উড ২/৫০)। ইংল্যান্ড: ৪০.৩ ওভারে ২১৫/১০ (ব্রুক ৬৬, মালান ৩২, আদিল ২০; রশিদ ৩/৩৭, মুজিব ৩/৫১, নবি ২/১৬)। ফল: আফগানিস্তান ৬৯ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মুজিব-উর-রহমান (আফগানিস্তান)।