উত্তাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) এখন অনেকটা নীরব। উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনের অনশন কর্মসূচি থেকে সরে এসেছেন শিক্ষার্থীরা। তবে মাঠ ছাড়েননি তারা। এখনো চলছে অহিংস নানা প্রতিবাদ কর্মসূচি। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে আয়োজন করা হয় ‘কেমন শাবিপ্রবি চাই’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক এখন উন্মুক্ত। দাবি মানার আশ্বাস এবং জনপ্রিয় লেখক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের অনুরোধে অনশন ভাঙেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে খুলে দেন প্রধান ফটক। সরিয়ে নেন উপাচার্যের বাসভবনের সামনের অনশনকারীদের জন্য অস্থায়ীভাবে নির্মিত প্যান্ডেল। নেই কোনো প্রতিবন্ধকতা। এর পরও উপাচার্যের পদত্যাগের ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে জানান শিক্ষার্থীরা। বিকাল ৪টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও দেখা গেছে খুব কম। এর পরও অবশ্য পুলিশের একটি টিম পালাবদল করে দায়িত্ব পালন করছে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে। উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ অবস্থান করছেন বাসভবনের ভেতরেই।
আয়োজিত উন্মুক্ত আলোচনার বিষয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আবেদিন জানান, শিক্ষার্থীরা আমরণ অনশন কর্মসূচি থেকে সরে এলেও উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন চলবে। বর্তমান উপাচার্য ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত। আর উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে অপসারণের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারির আগ পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যেতে শিক্ষার্থীরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এরই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চে ‘কেমন শাবিপ্রবি চাই’ শীর্ষক একটি উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি এবং সামনের বিশ্ববিদ্যালয় কেমন হবে তা নিয়ে আলোচনা চলে।
আগের দিন বুধবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে অনশন ভাঙার পর শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। এর পরই সেদিন রাত ১১টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের অবরোধ তুলে নেন। এ সময় ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকসহ অন্যান্য ফটক এবং প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনগুলোর তালাও খুলে দেয়া হয়।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের জানান, ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে আসছে। পুলিশ ক্যাম্পাসে রয়েছে। উপাচার্যও তার বাসভবনে রয়েছেন। তার নিরাপত্তায় পুলিশ নিয়োজিত রয়েছে।
১৩ জানুয়ারি প্রভোস্টের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে আন্দোলন শুরু করেন শাবিপ্রবির সিরাজুন্নেসা ছাত্রী হলের শিক্ষার্থীরা। পরে ১৫ জানুয়ারি ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক জহির উদ্দিন আহমেদ ও প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ড. আলমগীর কবিরের উপস্থিতিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বেধড়ক মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ১৬ জানুয়ারি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শাবিপ্রবি উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন। সে সময় পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন ছাত্র-ছাত্রীরা। তখন অন্তত ৪০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। ঘণ্টা তিনেক পর অবরুদ্ধ উপাচার্যকে উদ্ধার করেন পুলিশের ক্রাইসিস রেসপন্স টিমের সদস্যরা। পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষের পর শাবিপ্রবি উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। তারপর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
১৬ জানুয়ারি রাতে জরুরি সিন্ডিকেট সভা করে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরদিন দুপুর ১২টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশনাও দেয়া হয়। নির্দেশনার পর কিছু শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছেড়ে গেলেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে থেকে যান। তারা আবার একত্র হয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এসব আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে
পদত্যাগ করেন সিরাজুন্নেসা হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক জাফরিন আহমেদ। ওই হলের নতুন প্রভোস্ট হিসেবে নিয়োগ পান পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ড. নাজিয়া চৌধুরী।
১৯ জানুয়ারি থেকে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। ২৬ জানুয়ারি ভোর ৪টার দিকে জাফর ইকবাল দম্পতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আসেন এবং শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙার জন্য অনুরোধ করেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীরা তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে বুধবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে অনশন ভাঙেন।










