ত্রয়োদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপ মিশন শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের। আজ প্রথমেই সামনে আফগানিস্তান। ধর্মশালার হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে আজ বেলা ১১টায় মুখোমুখি হবে সাকিব আল হাসান ও হাশমতউল্লাহ শহিদির দল।

শক্তি-সামর্থ্যে বর্তমানে এই দুটি দল কাছাকাছি পর্যায়েরই। গত এক দশকে দ্বৈরথটা বেশ জমে উঠছে। এ বছর ফল সমানে সমান (২-২)। বাংলাদেশের মাটিতে আফগানরা ২-১-এ সিরিজ জিতলেও এশিয়া কাপে তাদের বেশ ভালো ব্যবধানে হারায় টাইগাররা। এক মাসের ব্যবধানে ফের মুখোমুখি তারা। এবার বিশ্বকাপে লড়বে দুই দল। 

প্রথমেই সামনে আফগানিস্তান হলেও বাংলাদেশের চোখ আরো দূরে। নিজেদের সপ্তম বিশ্বকাপ আসরে এবার সেমিফাইনাল খেলতে চায় টাইগাররা। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে বলেন, ‘ভালো বিশ্বকাপ কাটানো, ম্যাচ জেতা আমার লক্ষ্য। আমাদের লক্ষ্য সেমিফাইনালে।’

এবার সরাসরি বিশ্বকাপে উত্তীর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ। টাইগাররা বিশ্বকাপ সুপার লিগে চমক দেখিয়ে ২৪ ম্যাচে ১৫ জয় নিয়ে ১৪ দলের মধ্যে তিন নম্বরে ছিল। বিশ্বকাপে তাই বড় আশা করাই যায়। এ নিয়ে প্রশ্নের মুখে হাথুরুসিংহে বললেন, ‘দেখুন, আমরা সবাই বিশ্বকাপ জিততে চাই। যদি চার-পাঁচটা ম্যাচ জিতি তাহলে সেমিফাইনালে খেলার বা নকআউট পর্বে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা তৈরি করতে পারব। এটা আমাদের প্রথম লক্ষ্য। এটি করার জন্য আমাদের যথেষ্ট ভালো দল আছে। প্রথমে আমাদের সেমিফাইনালে যেতে হবে।’

বিশ্বকাপ সুপার লিগে দুর্দান্ত পারফর্ম করা বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তামিম ইকবাল। সেই তামিম নেই বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। তিনি পিঠের ব্যথার চিকিৎসা নিচ্ছেন কয়েক মাস ধরে। বিশ্বকাপে খেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ‘আনফিট’ কিংবা ‘অর্ধফিট’ কোনো খেলোয়াড়কে দলে রাখতে চাননি অধিনায়ক সাকিব ও কোচ হাথুরুসিংহে।

বিশ্বকাপের দল ঘোষণার সময় ও এরপর যেসব ঘটনার অবতারণা হয় তা ছিল রীতিমতো লজ্জাজনক। তামিম ইস্যুতে কাঠগড়ায় ওঠেন অধিনায়ক সাকিব, কোচ হাথুরুসিংহে আর বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। এ ঘটনার রেশ বিশ্বকাপেও থাকবে এবং দলের বিপর্যয় ঘটবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন অনেকে। যদিও দুটি ওয়ার্মআপ ম্যাচে বাংলাদেশ দল মোটামুটি ভালো পারফর্ম করায় স্বস্তি ফিরছে দলে। রানে ফিরেছেন ডানহাতি ব্যাটার লিটন দাস, আর তামিমের জায়গায় দলে ঢোকা বামহাতি ব্যাটার তানজিদ হাসান তামিম দুটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। 

তাই ওপেনিং নিয়ে আপাতত দুশ্চিন্তা কমেছে হাথুরুর। তবে লিটন ও তানজিদই যে ওপেন করবেন, সেই নিশ্চয়তাও তিনি দেননি। তিনি ব্যাটিং অর্ডার সাজাবেন পরিস্থিতি দেখে! 

সংবাদ সম্মেলনে লংকান এ কোচ বলেন, ‘আমাদের বেশ কজন বিকল্প আছে। কালকে (আজ) সকালে সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করার জন্য ভালো অবস্থায় আছি আমরা। সকালে আমরা দেখব, আগে ব্যাটিং করলে কাদের কাজে লাগানো যায় কিংবা পরে ব্যাটিং করলে কোন দুজন একসঙ্গে নামবে।’

হাথুরুকে স্বপ্ন দেখান একঝাঁক তরুণ, যারা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতেছেন। তৌহিদ হৃদয়, শরিফুল ইসলাম, তানজিদ হাসান, তানজিম হাসানকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের চার থেকে পাঁচজন খেলোয়াড় আছে এ গ্রুপে। তারা দলে ইতিবাচক আবহ নিয়ে এসেছে। অতীতে তারা বড় আসরে খেলেছে। তাদের এনার্জিও অনেক। তাদের নিয়ে আমার উচ্চাশা, আমরা আসরটি উপভোগ করতে চাই।’ 

ওয়ানডেতে এখন পর্যন্ত ১৫ বারের মুখোমুখিতে বাংলাদেশ ৯টি ও আফগানিস্তান ৬টি ম্যাচ জিতেছে। সর্বশেষ দুটি জয় বাংলাদেশেরই। গত মাসে লাহোরে এশিয়া কাপের ম্যাচে আফগানিস্তানকে ৮৯ রানে হারায় সাকিবের দল। ওই ম্যাচে সেঞ্চুরি করেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও মেহেদী হাসান মিরাজ। এর পরও বিশ্বকাপে ফল নিজেদের পক্ষে নিতে আশাবাদী আফগানরা। দলটির অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শহিদি গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রত্যয়ের কথাই শোনালেন। 

অবশ্য আফগানদের অনুপ্রেরণার রসদও আছে। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশের মাটিতে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজ তারা জিতেছে ২-১-এ। অভিজ্ঞতা এবার বিশ্বকাপে কাজে লাগাতে চায় আফগানিস্তান। শহিদি বলেন, ‘আমরা একে অন্যের বিপক্ষে অনেক খেলেছি। কখনো আমরা জিতেছি, কখনো তারা। এশিয়া কাপে সবশেষ ম্যাচে তারা আমাদের হারিয়েছে। তবে আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত। আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। নিজেদের প্রস্তুত করেছি। তাদের খুব ভালোভাবে চিনি। তো আমরা সেভাবেই খেলব এবং দল হিসেবে সেরাটা দিয়ে তাদের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’

এশিয়া কাপে বাংলাদেশের কাছে হারের ম্যাচ থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোতে চান আফগান অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘বিশেষ কিছু নয়। স্বাভাবিক বিষয়, আমাদের নিজেদের শক্তিমত্তায় মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের শক্তি কোনটা, তাদের দুর্বলতা কোনটা। সবশেষ ম্যাচে যা হয়েছে, আমাদের সেখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তারা আমাদের চেয়ে ভালো খেলেছে। তো আমরা তাদের থেকে শিখব এবং আগামীকাল (আজ) সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। আমরা ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করব।’

গত বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি চায় না আফগানরা। ইংল্যান্ড আসরে ৯ ম্যাচ খেলে সবগুলোতেই হেরে যায় তারা। ওই আসরের হতাশা ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়া প্রত্যয় ঝরল তার কথায়। শহিদি বলেন, ‘সেটি অতীত। চার বছর হয়ে গেছে। আমরা এখন এ দল নিয়ে ভাবছি, যারা গত ২-৩ বছর কঠোর পরিশ্রম করেছে। অন্যান্য বিশ্বকাপের তুলনায় এবার অনেক তরুণ তারকা রয়েছে। আমরা ইতিবাচক থাকব এবং এ বিশ্বকাপে ইতিবাচক খেলার চেষ্টা করব। ভালো শুরুর জন্য কাল (আজ) আমরা সেরাটা দিয়েই চেষ্টা করব।’

বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান প্রথম মুখোমুখি হয় ২০১৪ সালে। ফতুল্লায় প্রথম দেখায়ই বাংলাদেশকে ৩২ রানে হারিয়ে চমকে দেয় আফগানিস্তান। এরপর ১৪ ম্যাচের ৯টি জিতে অবশ্য বাংলাদেশই এ দ্বৈরথে কর্তৃত্ব করে। 

বিশ্বকাপে দুবারের দেখায় দুবারই জিতেছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে ক্যানবেরায় আফগানদের ১০৫ রানে হারায় বাংলাদেশ। ২০১৯ সালে সাউদাম্পটনে সাকিব ম্যাজিকে টাইগাররা জিতেছে ৬২ রানে। ব্যাট হাতে ৬৯ বলে ৫১ রান করার পর বল হাতে ২৯ রানে ৫ উইকেট শিকার করে তিনি একাই হারিয়ে দেন আফগানদের। 

আফগানিস্তানের বিপক্ষে ১৪ ইনিংসে ৩০.৬৯ গড়ে ৩৯৯ রান করেছেন সাকিব, যা দেশের হয়ে দ্বিতীয় সেরা। ফিফটি দুটি। উইকেট নিয়েছেন ২৭টি। সেরা ফিগার ৫/২৯। সাউদাম্পটনের মতোই কি আজ ব্যাট-বলে জ্বলে উঠবেন সাকিব? যদি অধিনায়ক ছন্দ খুঁজে পান, তবে জয়ের আশা জাগবে বাংলাদেশের। 

ধর্মশালার উইকেট চিরাচরিতভাবে পেসবান্ধব। এখানে মিডিয়াম পেসাররা সুবিধা পান। সুইং পান বোলাররা। টস জয়ী দলটি চোখ বন্ধ করেই বোলিং বেছে নিতে পারে। 

২০১৬ সালের টি২০ বিশ্বকাপে ধর্মশালায় তিনটি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। নেদারল্যান্ডস ও ওমানের বিপক্ষে জিতলেও বৃষ্টিতে পণ্ড হয় আয়ারল্যান্ড ম্যাচ। 

এদিকে আজ দিল্লিতে মুখোমুখি হবে ১৯৯৬ আসরের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শ্রীলংকা ও দক্ষিণ আফ্রিকা। মাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় বেলা ২টা ৩০ মিনিটে।