গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। চারদিনের ওই সফরের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল রোহিঙ্গা সংকট। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পও পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নিয়ে সংকটটির দিকে আবারো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন জাতিসংঘ মহাসচিব। সেদিন প্রত্যাবাসন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়া করি, সামনের বার যেন আপনারা নিজের বাড়িতে গিয়ে ঈদ করতে পারেন।’ পরে ঈদ উপলক্ষে দেয়া বার্তাতেও একই প্রত্যাশার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। এর ছয় মাস পর, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হয় ‘রোহিঙ্গা মুসলিম ও মিয়ানমারের অন্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতিবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলন’। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসনকে সংকটের টেকসই সমাধান হিসেবে জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়।
তবে এরপর রোহিঙ্গা পরিস্থিতির উন্নতি তো হয়ইনি, উল্টো আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। রাখাইনে সংঘাত আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই সময়ে সংকট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহায়তার পরিমাণও কমে এসেছে নাটকীয়ভাবে।
২০২৫ সালে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান বা জেআরপির আওতায় ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার চাওয়া হয়েছিল। বছর শেষে পাওয়া যায় ৪৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার—চাহিদার মাত্র ৪৬ শতাংশ। ২০১৭ সালের পর কোনো বার্ষিক জেআরপিতে অর্থায়নের হার এত নিচে নামেনি।

চলতি বছর অর্থ সংকটের কারণে পরিকল্পনাটিই ছোট করে ফেলেছে জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো। ২০২৬ সালের জন্য চাওয়া হয়েছে ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) ফাইন্যান্সিয়াল ট্র্যাকিং সার্ভিসের তথ্যভিত্তিক ১৪ জুলাই পর্যন্ত হালনাগাদ অনুযায়ী, এ চাহিদার বিপরীতে ৩১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার অর্থায়নের তথ্য রিপোর্ট হয়েছিল, যা মোট চাহিদার ৪৪ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থায়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে প্রয়োজনীয় সহায়তার বড় অংশই ঘাটতিতে থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, আশ্রয়, শিক্ষাসহ প্রায় সব মানবিক খাতে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সহায়তা এভাবে কমতে থাকলে শিগগিরই রোহিঙ্গা সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকিও তৈরি করবে।
আর্থিক সহায়তা ও প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা—দুটোই কমে আসায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আছে বলে মনে করেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পরিচালক অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি কঠিন। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে রাখাইনের বর্তমান বাস্তবতা পরিস্থিতিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গাদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরার বিষয়ে যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, সেগুলো অনেকটাই রেটরিক ছিল। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি চিন্তা করা হয়নি।’
২০১৭ সালেও প্রত্যাবাসন ও আন্তর্জাতিক সহায়তা—দুই ক্ষেত্রেই বর্তমানের তুলনায় পরিস্থিতি ভালো ছিল জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ গত নয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও প্রত্যাবাসন করতে পারেনি। উল্টো গত দুই বছর আরো প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের ওপর কীভাবে কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা যায়, সেটি নিয়ে পরিকল্পনা করা জরুরি। আগামী নয় বছরেও যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব না হয়, তাহলে বাংলাদেশ কী করবে—এখন থেকেই সে বিষয়ে কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।’
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দেয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু একই ঘোষণায় মিয়ানমার জানিয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাবাসন শুরু হবে না।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অমীমাংসিত বিষয়গুলোর একটি হলো নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার। মিয়ানমার এখনো রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। একই সঙ্গে স্বাধীনভাবে চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানে প্রবেশাধিকার নিয়েও স্পষ্ট নিশ্চয়তা নেই। ফলে শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলেই প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না; ফেরার পর রোহিঙ্গারা কী আইনি মর্যাদা পাবে এবং নাগরিক হিসেবে কী অধিকার ভোগ করবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধা এখন রাখাইনের পরিস্থিতি। জাতিসংঘের ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার (আইআইএমএম) গত মাসের শেষ দিকে জানায়, রাখাইন এখনো অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক। সেখানে বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা, নির্বিচার আটক, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
আরাকান আর্মি বর্তমানে রাখাইনের ৯০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ সীমিত হয়ে পড়েছে মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অবস্থানে। যেসব এলাকায় রোহিঙ্গাদের ফেরার কথা, তার বড় অংশেই মিয়ানমার সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেই। এর মধ্যে রাখাইনে বিমান হামলা তীব্র করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। গত ২৮ সেপ্টেম্বর কিয়াউকতাওয়ের একটি ব্যস্ত বাজারে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ৫০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর রাথেডংয়ে আরো একজন এবং ৪-৫ অক্টোবর পোনন্যাগুনের বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবির ও চিকিৎসা কেন্দ্রে হামলায় আটজন নিহত হন। রাখাইনে বাড়তে থাকা এ গৃহযুদ্ধ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে আরো অসম্ভব করে তুলছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু মানবিক সহায়তার ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। দীর্ঘদিন ক্যাম্পে অবস্থান করা রোহিঙ্গা শিশু ও তরুণরা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও নিয়মিত জীবিকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে তাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, হতাশা ও অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রায় এক দশক ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশের জাতিসংঘ মিশনও বলছে, দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি ও কমতে থাকা মানবিক অর্থায়ন খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ক্যাম্পগুলোতে অপরাধ, মানব পাচার ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় ক্যাম্পগুলোতে নানা ধরনের অস্থিরতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শিশুদের মধ্যে পুষ্টিজনিত সমস্যা দেখা দিচ্ছে, গর্ভবতী নারীরাও এর প্রভাবের বাইরে নন। একই সঙ্গে সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। ক্যাম্পের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব ভালোও নয়, আবার একেবারে খারাপও নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা ও সহায়তা সংকট অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব আরো বাড়তে পারে।’ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সম্ভাবনা আমরা সবসময়ই দেখি। তবে এটি মূলত মিয়ানমারের যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। এটি তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান হওয়ার মতো বিষয় নয়। রাখাইনের পরিস্থিতি অনুকূল হলেই এক্ষেত্রে অগ্রগতি সম্ভব।’
প্রত্যাবাসনের আশা ক্ষীণ হওয়া এবং ক্যাম্পে শিক্ষা ও জীবিকার সীমিত সুযোগ রোহিঙ্গাদের অনিয়মিত পথে অন্য দেশে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়াচ্ছে। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধীন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (আরএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে যাত্রার চেষ্টা করেছে; তাদের প্রায় ৯০০ জন মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে। চলতি বছরেও এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ওয়াশিংটন জান্তা সরকার ও সামরিক বাহিনীসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর নেপিদোতে এবং অক্টোবরে টোকিওতে মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকারের সঙ্গে দুই দফা উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৈঠকের কারণ হিসেবে ওয়াশিংটন মার্কিন নাগরিকের মুক্তি ও সাইবার প্রতারণার কেন্দ্র বন্ধের মতো বিষয়গুলো সামনে আনলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারের বিপুল রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকারের বিষয়টি ওয়াশিংটনের আগ্রহের অন্যতম জায়গা। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুৎ প্রযুক্তি ও বিভিন্ন উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যে ব্যবহৃত এসব খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহে বর্তমানে চীনের আধিপত্য রয়েছে। ফলে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৌশলগত গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি আগের তুলনায় অনেক বেশি লেনদেনভিত্তিক বা ‘ট্রানজেকশনাল’; সেখানে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বড় হয়ে উঠছে। এ পরিবর্তন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। ওয়াশিংটন যদি জান্তার সঙ্গে যোগাযোগ, বিরল খনিজে প্রবেশাধিকার এবং আঞ্চলিক কৌশলগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে মানবাধিকার ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর আগের মতো কঠোর চাপ অব্যাহত না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক মিয়ানমার নীতি পরিবর্তনের আভাস দুই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন ফ্রান্সের কেজ বিজনেস স্কুলের জিওপলিটিকস স্ট্র্যাটেজি ল্যাবের প্রধান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ এম জসীমউদ্দীন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মানবাধিকার পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে শেভরন, টোটালএনার্জিস ও উডসাইডের মতো বড় বিদেশী জ্বালানি কোম্পানিগুলো মিয়ানমারে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ায়, তাহলে সেই যোগাযোগ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন যদি কেবল চীনের প্রভাব মোকাবেলা ও বিরল খনিজে প্রবেশাধিকার এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে, তাহলে রোহিঙ্গা ও মানবাধিকার ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর চাপ কমে যেতে পারে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের উচিত ওয়াশিংটন ও নেপিদোর নতুন যোগাযোগের মধ্যে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়া, যাতে এ চ্যানেলকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা তৈরির চেষ্টা করা যায়।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন সাংবাদিক তানভিরুল মিরাজ রিপন। যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ানমার নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিতের কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আরো চাপ দুর্বল হয়ে আসছে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘এতে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাও আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমার পাশাপাশি সামনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তাও কমতে পারে। আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার ও কৌশলগত ফোকাস বদলে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট ধীরে ধীরে বৈশ্বিক মানবিক সংকটের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে পিছিয়ে পড়ছে।’
তানভিরুল মিরাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্যাম্পগুলোর বর্তমান অবস্থা খুবই করুণ। দীর্ঘদিন রেশনের ওপর নির্ভরতা যেমন এক ধরনের ডিপেনডেন্সি তৈরি করেছে, তেমনি ফান্ড কমে যাওয়ায় হতাশাও বাড়ছে। স্বাস্থ্য খাত, বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রায় বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থায়। শিক্ষা খাতও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামনে আন্তর্জাতিক সহায়তা আরো কমলে পরিস্থিতি আরো নাজুক হবে এবং এর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এতে অপরাধ বাড়তে পারে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও বেপরোয়াভাবে রোহিঙ্গা তরুণদের বিভিন্ন অপকর্মে রিক্রুট করার সুযোগ পেতে পারে। এর বড় প্রভাব কক্সবাজারের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও সামাজিক পরিবেশে পড়বে। এ সংকট ভবিষ্যতে শুধু রোহিঙ্গাদের নয়, বাংলাদেশের জন্যও বড় সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।’










