ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। গত কয়েক মাসে দু’দেশই এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথে নিজেদের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে। ফলে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। তবে সাম্প্রতিক জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ধীরে ধীরে অবস্থান শক্ত করছে এবং জলপথটির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের বরাত দিয়ে সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজের ৮০ শতাংশের বেশি ওমানের দিকের একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবহার করেছে। জাতিসংঘ অনুমোদিত এ পথের বিরোধিতা করে আসছিল ইরান।
ঝুঁকি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে বেশির ভাগ জাহাজ ইরানের নির্দেশ উপেক্ষা করে ওমানের উপকূল ঘেঁষা পথ ব্যবহার করছে। তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনী।
কেপলারের অপরিশোধিত জ্বালানি বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহী বলেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে ইরান অন্তত আংশিকভাবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।
বদলে গেছে জাহাজ চলাচলের পথ
মাত্র এক মাস আগেও ওমানের পথ দিয়ে প্রায় কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করত না। ইরানের পছন্দের রুটে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ায় প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজ থেকে টোল আদায়ের সুযোগও হারিয়েছে তেহরান। বসন্তে এমন টোল আদায় করেছিল ইরান।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আবার টোল আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবে ইরান তা করতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না।
এদিকে কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগর থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য বিশাল আকৃতির তেলবাহী জাহাজ বা ভিএলসিসি ভাড়া করেছে। এসব জাহাজ বিপজ্জনক এলাকা পেরিয়ে ওমান উপসাগরে গিয়ে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করছে।
ইরানের হামলা এড়াতে অনেক জাহাজ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত তাদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখছে। ফলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কিছু জাহাজ শনাক্ত করা গেলেও প্রচলিত ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় এগুলোর গতিবিধি ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে সমুদ্রে বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপর তাদের নজরদারি তুলনামূলকভাবে বেশি। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট গত সপ্তাহে জানিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরাসরি যাওয়া এবং বিকল্প পথে পরিবহন—দুই মিলিয়ে এক সপ্তাহে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হতো।
এ তথ্যের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ রয়েছে।
তবে ইরানের অব্যাহত হামলা এবং যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় কম তেল পরিবহন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো পুরোপুরি জলপথটির নিয়ন্ত্রণ নেয়নি। অন্যদিকে ইরানের অবস্থাও আগের মতো শক্তিশালী নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের লক্ষ্য সম্ভবত পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নয়, বরং ভয় তৈরি করে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু যদি যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল নিয়মিত হরমুজ দিয়ে পরিবহন করা সম্ভব হয়, তাহলে গত এক-দুই মাসের তুলনায় ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ স্পষ্টতই দুর্বল হয়েছে।










